আমার 'দোষী' বাবার মতো মানুষ বড় প্রয়োজন

আপডেট : ২১ জুন ২০২০, ০৭:৩৬ পিএম

বাবাকে আমি কাছে পাইনি বেশিদিন। ছোটবেলায় প্রায় প্রতিদিন শুনতাম মার অভিযোগ- নীতির জন্য আপস করতে পারলে না, অমন ভালো চাকরিটা ছেড়ে দিলে! হ্যাঁ, নীতির প্রশ্নে বাবা ছিলেন বরাবরই আপসহীন।

আমি প্রাইমারিতে থাকতেই বাবা চলে যান আরব দেশে। উপার্জনের চেয়ে নবীর দেশে থাকাটাই বোধ করি বাবার কাছে ছিল মুখ্য। বেশ ক'বছর পর যেদিন ফিরে এলেন সেদিন রাতে বেশ 'বড়' হয়ে যাওয়া আমাকে কিছুতেই বাবার কাছ থেকে দূরে সরান যাচ্ছিল না। অন্যরকম একটা পবিত্র ঘ্রাণ পেতাম বাবার কাছে, যেটা পরিবারের অন্য কারো কাছেই পেতাম না।

বাবার বিরূদ্ধে মার নিয়মিত অভিযোগ- তুমি একটা বোকা। হ্যাঁ, বড় বেশি বোকাই তো ছিলেন বাবা! কেননা রাস্তায়, বাজারে, চায়ের দোকানে অকপটে সত্য বলে ফেলতেন তিনি! অপ্রয়োজনে প্রভাবশালী কেউ-ও যদি বাতি জ্বালিয়ে রাখত, তাকেও অপচয়ের কুফল সম্পর্কে সতর্ক করে দিতেন! অনধিকার চর্চা করে স্বল্পপরিচিত কাউকে তার পরিত্যক্ত জায়গায় বৃক্ষরোপণ করতে বলতেন! দরিদ্র বিক্রেতার পরিবারের কথা ভেবে অপ্রয়োজনীয় জিনিস বেশি দামে কিনে 'ঠকে' যেতেন! সব মানুষকে 'মানুষ' ভেবে সহজেই বিশ্বাস করতেন। এ ক্ষেত্রে অবশ্য তিনি আর্থিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু মানুষের কাছে ঠকে তার খুব একটা আফসোস ছিল বলে কখনো মনে হয়নি।
আর বাবার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল- আমাকে অতিরিক্ত স্নেহ করতেন, আদর দিয়ে নষ্ট করে ফেলতেন।

তবে নানা দোষে দোষী বাবার কিছু ভালো গুণও ছিল। বাবাকে কবর দেওয়ার আগে সম্মিলিত জনতার উদ্দেশ্যে আমি সেগুলো বলেছিলাম। জানি, সেগুলো তাদের কাছে খুব সাধারণ কিছুই মনে হয়েছিল। বলেছিলাম, লোভ-অহংকার-হিংসা কোনোটাই আমার বাবার মধ্যে ছিল না। অনেক অভিভাবকের মতো তার মুখে কখনো সন্তানদের বড় হয়ে টাকা কামাবার উপদেশ দিতে শুনিনি।

বাবা ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। নিয়মিত খবরের কাগজ পড়তেন। তার সমসাময়িক অন্যদের তুলনায় দেশ-বিদেশের খবরাখবর খুব ভালো রাখতেন। সেজন্য বড়দের আড্ডায় বাবা বেশি কথা বলেন বলে মা অভিযোগ করলেও আমি বুঝতাম, বাবার কাছে পর্যাপ্ত তথ্য থাকত বলেই তিনি যুক্তিসহকারে বেশি কথা বলতে পারতেন।

ইংরেজীতে ভালো ছিলেন বাবা। ভূগোলে ছিল তার ব্যাপক আগ্রহ। ঘরের সুন্দর দেয়ালে বড় মানচিত্র সেঁটে সৌন্দর্য নষ্ট করার অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। প্রতিদিন নিয়ম করে তিনি মানচিত্রে দেশ-বিদেশের আয়তন, নদ-নদী, শহরের হিসেব মেলাতেন এবং আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতেন। যার সুফল আমি সবসময় পাচ্ছি।

অনেক প্রশংসা করা হলো বাবার। দোষেগুণেই মানুষ। বাবারও নিশ্চয়ই ভুল-ত্রুটি-দোষ ছিল। একজন মানুষের চরিত্রের বেশিরভাগ দিক ভালো হলে যদি তাকে 'ভালো মানুষ' বলা যায়, তাহলে বাবা নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ ছিলেন এবং সেটা বুঝেশুনেই। তিনি ছিলেন সৎ, সচেতন, দেশপ্রেমিক। আজকের দিনে বাবার মতো মানুষের খুব প্রয়োজন।

তারিক চয়ন: সাংবাদিক।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত