করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে গোটা বিশ্বেই এক অস্থিরতা চলছে। এই অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক সংকট দেখা দিয়েছে। আর এসব সংকটের মধ্যে বিশ্ব নেতৃত্বের সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকটাকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) এই বিষয়টির দিকে আলোকপাত করে। সংস্থাটির প্রধান তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসুস বলেছেন, বিশ্বে নেতৃত্ব ও ঐক্যের অভাব মহামারীর চেয়েও বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ সঠিক নেতৃত্ব না থাকলে বিশ্ববাসীকে নিকট ভবিষ্যতে চরম নৈরাজ্যের দিকে যেতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
গত সোমবার দুবাইয়ে ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিটের আয়োজনে স্বাস্থ্যবিষয়ক এক ভার্চুয়াল ফোরামে আধানম বিশ্ব নেতৃত্ব সংকটের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের এখন একান্ত প্রয়োজন ঐক্য ও সংহতি। এই মহামারীর রাজনীতিকরণ সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এই ভাইরাস নয়, এই মুহূর্তে যে বড় হুমকি আমরা মোকাবিলা করছি, তা হচ্ছে বৈশ্বিক সংহতি ও নেতৃত্বের অভাব।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তার বক্তব্যের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিলেও করোনাভাইরাস মহামারীকালে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ডব্লিউএইচওর বিরুদ্ধে চীনের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে সংস্থাটিতে তহবিল জোগানো স্থগিত করেছে।
বাণিজ্য নিয়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপড়েন কয়েক বছর ধরে চলছিল। সেই দূরত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে করোনাভাইরাস মহামারী। শুধু তাই নয়, বাণিজ্যিক লড়াইয়ের নতুন নতুন ফ্রন্টও তৈরি হয়েছে, যা একই সঙ্গে অনেকগুলো দেশকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত বছরের শেষে চীনের উহানে নতুন এই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর দেশটি বিশ্বকে তথ্য না দিয়ে তা গোপন করতে চেয়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ। এই অভিযোগের ছাতার তলায় অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ যুক্ত হয়েছে, যা নতুন এক বলয় গঠিত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীন থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর মহামারীতে বিপর্যস্ত এখন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বে আক্রান্ত ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৩ লাখই যুক্তরাষ্ট্রের। আবার এই মহামারীকালে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংঘাতের পর উত্তেজনা চলছে। ভারত-চীনের সীমান্ত সংঘাতের আঁচ বৈশ্বিক বিভিন্ন ফোরামে পৌঁছে গেছে। ইতিমধ্যে মঞ্চে প্রবেশ করেছে রাশিয়া, দেশটি চীন-ভারতের মধ্যে সমঝোতা করাতে চায়। আবার রাশিয়ার ঘরেও সমস্যার শুরু হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন আরও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চাইছেন। করোনার সময়কে কাজে লাগিয়ে তিনি সংবিধান সংস্কারের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার শত্রু দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভরাডুবি হতে পারে এমন জরিপও বের হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো কড়া ভাষায় না হলেও এই মহামারী মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। দুবাইয়ের ফোরামে আলোচনায় গ্যাব্রিয়েসুস বলেন, কিছু অঞ্চলে মহামারী মোকাবিলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাজটি আরও জোরদার করা দরকার। কিন্তু কোন কোন অঞ্চলে তা স্পষ্ট করেননি তিনি। ক’দিন আগেই ডব্লিউএইচও সতর্ক করেছিল, করোনাভাইরাস এখন আরও দ্রুত ছড়াচ্ছে। এরপর এক দিন আগেই ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৩ হাজার ২০ জন কভিড-১৯ রোগী শনাক্তের কথা জানায় সংস্থাটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বলেন, এখন সব দেশেরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর।
