বহুদিন পর বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মতো কোনো ঘটনা একত্রে ইউরোপ-আমেরিকাকে মূল থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ঝাঁকুনিটা এত জোরে লেগেছে যে, দেশগুলো তাদের এতদিনে শৌর্যগাথা সংবলিত অনেক ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। প্রশাসন এখনো বর্ণবাদী রয়ে গেছে, কিন্তু বর্ণবাদ ইস্যুতে তারা প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে যেতে পারছে না। আর এই না পারার কারণেই ভাস্কর্যগুলো সরে যাচ্ছে।
একেক অঞ্চলে একেক কায়দায় ভাস্কর্য অপসারণের ঘটনা ঘটেছে। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানের চাকায় ভর করে সাদ্দাম হোসেনের বিশাল কালো পাথরের মূর্তির পতন হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে জন্ম নেওয়া দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত জোয়ারে একের পর এক লেনিনের মূর্তির পতন হয়। এ মূর্তিগুলোর প্রতি আন্দোলনকারীদের ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ হলো, আন্দোলনকারীরা এ মূর্তিগুলোকে একটি কুৎসিত সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে চিন্তা করে। এ মূর্তিগুলোর পতনকে তারা ওই সময়ের বিপরীতে নিজেদের বিজয় হিসেবে দেখে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের যত মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়েছিল, তার অধিকাংশকেই জড়ো করে গলিয়ে ফেলা হয় বা বিভিন্ন সংগ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেউ জানে না, মূর্তিগুলোর ভগ্নাংশের শেষ গন্তব্যস্থল কোথায় হয়েছে। অনেকটা বাতাসের মতোই মিশে গেছে যেন।
জার্মানির শহরগুলোতে নাৎসি যুগের কোনো ভাস্কর্য চোখে পড়বে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অধিকাংশ ভাস্কর্যই বোমা মেরে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ১৯৪৬ সালে বিজয়ী মিত্রশক্তি এক বিবৃতিতে জানায়, থার্ড রেইখের কোনো চিহ্ন, যার মধ্যে ভাস্কর্যও রয়েছে, প্রদর্শন করা অবৈধ ও অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। শুধু তাই নয়, এমনটা পাওয়া গেলে তা তৎক্ষণাৎ ধ্বংসও করে ফেলা হবে। বার্লিনে জিউস মিউজিয়ামের প্রকৌশলী দানিয়েল লিবেসকাইন্ডের মতে, ‘যা মানুষের ন্যায়বিচার ও সত্যকে আহত করে সেসব চিহ্ন উপড়ে ফেলাই ভালো, যেমনটা জার্মানরা করেছে।’ তবে মূর্তি বা চিহ্ন ধ্বংস করলেও ইতিহাস ঠিকই রয়ে যায়।
অনেক দেশ এখনো তাদের অতীতের নিষ্পেষণকারীদের ভাস্কর্য ও মূর্তি বেশ সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছে। এমন দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম। যে ব্রিটিশরা ভারতের সম্পদ লুট করে ইংল্যান্ডের জৌলুস বাড়িয়েছে, সেই ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরও তাদের সবকিছু অক্ষত রয়ে গেছে ভারতে। ব্রিটিশ আমলের ভাইসরয়ের বাসভবনটি এখন ভারতের রাষ্ট্রপতির বাসভবনের জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এমনকি দেশটির যে আদালত প্রাঙ্গণে বহু বিপ্লবীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যা থেকে শুরু করে জেল-জরিমানা করা হয়েছে, সেই আদালত প্রাঙ্গণে থাকা ব্রিটিশ মনিবদের মূর্তিগুলো আজও অবিকল হয়ে আছে।
