উন্নয়নের ক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য শার্দুল বাংলাদেশের সামনে কভিড-১৯ অনেক চ্যালেঞ্জ হাজির করে ফেলেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বই আজ এক অজানা-অদৃশ্য শত্রুর থাবায় কুপোকাত। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক প্রাক্কলন করেছে যে, বৈশ্বিক অর্থনীতি এ বছর ৫ দশমিক ২ শতাংশ হারে সঙ্কুচিত হতে পারে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ পর্যায়ের খারাপ অবস্থা আর কখনো হয়নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেছে যে, বাংলাদেশ কভিড-১৯ এর ত্রিমুখী আঘাতের শিকার : দীর্ঘ ছুটিজনিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থবিরতা, রপ্তানির আকস্মিক পতন এবং প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণে কমতি। বর্তমানে দেশে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রিজার্ভ গড়ে উঠলেও গত বছরের এপ্রিল থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রপ্তানি ৮৩ শতাংশ কমে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছে ২ শতাংশ, অবশ্য আগামী বছরের জন্য তাদের প্রাক্কলন ৬ শতাংশ। বিআইডিএস তাদের এক গবেষণাপত্রে দেখিয়েছে যে, কর্মহীনতার কারণে দেশে নতুন করে এক কোটি চৌষট্টি লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে। আবার বছর শেষে চরম দারিদ্র্যের হার বর্তমানের ১০ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে উঠে যেতে পারে। এগুলো শুধু সংখ্যা; বাস্তব অবস্থা বোঝার জন্য এগুলোর পঠন-পাঠনের ততটা প্রয়োজন হয় না, মাঠের প্রকৃত অবস্থা একটু মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট।
কভিডের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অগ্রভাগেই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। আইএমএফও এই কাজে ৭৩২ মিলিয়ন ডলারের একটি জরুরি ঋণ অনুমোদন করেছে। ইতিমধ্যে এসবের কার্যক্রমও শুরু হয়ে গিয়েছে। স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের মধ্যে লকডাউনের গ্যাঁড়াকলে আটকে পড়া অসহায় মানুষদের জন্য মুখের গ্রাস সরবরাহ করা, স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য বিনামূল্যে ও ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ করা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি আয় সহায়তা দেওয়া, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা প্রভৃতি দৃশ্যমান। লকডাউন অব্যাহত রাখা হলে এই জাতীয় স্বল্পমেয়াদি জীবন রক্ষাকারী সেবার খরচ আরও বাড়ানোর প্রয়োজন হবে। অন্য দিকে আম্পান, ডেঙ্গু এবং বর্তমানে বন্যার আশঙ্কা সবই খরচের হিসাবকে প্রলম্বিত করছে। আমাদের এখনকার আর্থিক অবস্থা, ত্রাণ বিতরণে লক্ষ্যচ্যুতির মাত্রা ও দক্ষতা, বেসরকারি সহযোগিতার অপ্রতুলতা, স্বল্প আয়ের মানুষের সংখ্যা এবং তাদের আর্থিক সামর্থ্য, আমাদের ব্যবস্থাপনার দক্ষতা প্রভৃতি বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি লকডাউন কোনো সমাধান নয়; তা বরং দেশের অর্থনীতি এবং নাগরিকদের জীবন ও জীবিকাকে আরও বিপন্ন করে তুলবে। তিন মাস ছুটি কাটানোর পর এখনো আমরা সংক্রমণের চূড়ায় পৌঁছাতে পারিনি; বিশেষজ্ঞরা বলছেন হয়তো আমরা জুলাই মাসে চূড়া ছুঁতে পারি। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ঈদুল আজহার শোভাযাত্রা শুরু হলে তা সুবিন্দুকে আরও দূরবর্তী করবে। অনেক দেশে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ সেটাই ইঙ্গিত দেয়। কাজেই বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে আমরা যেমন সহাবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, টিকা আসার আগ পর্যন্ত করোনার সঙ্গে সেই ভাবে বসবাসের অভ্যস্ততার কৌশল আমাদের অর্জন করতে হবে।
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসককে এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে লকডাউন প্রলম্বিত করার পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। তারা পরামর্শ দেন ঘরে থাকতে, টুকটাক ব্যায়াম করতে এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে। আমি অবসরপ্রাপ্ত মানুষ, মাসে মাসে ইএফটি-এর মাধ্যমে ব্যাংকে পেনশনের টাকা পাচ্ছি, এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলছি, ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে শাক-সবজি, আদা-রসুন, দুধ-ডাল কিনছি। আমি তাদের কথা আদাজল খেয়ে পালন করতে পারছি। কিন্তু আমার মতো এক অনুৎপাদনশীল নাগরিকের এই পারার মধ্যে সমাজের প্রাপ্তি কতটুকু? কিন্তু যাদের এখনো নিজে কাজ করে অন্নসংস্থান করতে হয় তারা কী করবে? সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে অনুসরণ এবং চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত ও শক্তিশালী করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে নেওয়াই দুই মন্দের মধ্যে ভালো বিকল্প।
করোনার প্রভাব মোকাবিলায় গতানুগতিক পদ্ধতিতে প্রণোদনার অর্থ ব্যবহারের পাশাপাশি একটা অংশ উদ্ভাবনী কাজে বিনিয়োগ করা জরুরি। যে কোনো জরুরি অবস্থা এবং কঠিন পরিস্থিতি উদ্ভাবনের জন্য উর্বর সময়। কারণ ‘প্রয়োজনই সব আবিষ্কারের জননী’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যত সমরাস্ত্র আবিষ্কৃত হয়, অন্য কোনো সময়ে কিন্তু তা হয়নি। ১৯০৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সংকটের পটভূমিতে জেনারেল মটরস-এর জন্ম, ১৯৫৩ সালে সে দেশে আর্থিক মন্দার সময় বার্গার কিং-এর সৃষ্টি, ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটকালে ‘উবার’ এবং ‘এয়ারবিএনবি’-এর সূত্রপাত। এগুলোর সবই একেকটা সফলতার রোল মডেল। বাঙালিরা সংকর জাতি এবং সেই সঙ্গে উদ্ভাবনী চিন্তার অগ্রদূত। এই কারণে ভারতের জাতির পিতা মোহনলাল করম চাঁদ গান্ধীর রাজনৈতিক গুরু গোপাল কৃষ্ণ গোখলে বলেছিলেন, ‘বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত তা ভাবে আগামীকাল’। চীনারা যেমন মুহুর্তের মধ্যে একই পণ্যের নানা সংস্করণ তৈরি করে ফেলে; কিছু খুব দামি, কিছু মাঝারি মূল্যমানের ও কিছু সস্তা এবং এই কৌশলে কোনো গ্রাহককে ফিরে আসার সুযোগ না দিয়ে ক্রেতার বাজেট অনুযায়ী সবাইকে পণ্য সরবরাহ করে ফেলে। বাঙালিদের মাঝেও অনুরূপ সামর্থ্য দেখা যায়, ‘ধোলাই খাল’ যার বড় প্রমাণ। সফলতার অনিশ্চয়তা এবং অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে এদেশে উদ্ভাবকদের পৃষ্ঠপোষকতার দৈন্যদশা সর্বজনবিদিত। যে দেশে প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতিদের কাছে লাখো কোটি টাকার মন্দঋণ অনাদায়ী থাকে, সেখানে উদ্ভাবকদের জন্য মামুলি কিছু তহবিল সরবরাহ কেন আলোর মুখ দেখবে না, তা বোধগম্য নয়। এটা মন্দঋণে পরিণত হলেও তেমন ক্ষতি নেই, অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হবে, এ টাকা কখনো সুইস ব্যাংকে যাবে না। তবে এখানে মান নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে শুধু দক্ষতার সঙ্গে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেই হবে।
এই দুঃসময়ে এবং দীর্ঘ ছুটির দিনে অনেকেই বাধ্য হয়ে গ্রামে গিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করছেন, অনেকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করছেন, অনেকে নতুন ও উন্নত মানের স্বাস্থ্যকর পণ্য উৎপাদন করছেন এবং সেগুলো বাজারজাতকরণের আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য চ্যানেল বের করছেন, আবার কেউ বা তাদের গ্রামের নড়বড়ে বাড়িটিকে একটু শক্তপোক্ত করে সেটাকে বসবাস ও উৎপাদনশীলতার উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলছেন। সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা দৃশ্যমান তা হলো বেসরকারি পর্যায়ে অনলাইন শপিং এবং ই-কমার্স অনেকটা যেন বাধ্যতামূলক ভাবেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই সব নতুন নতুন কাজে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হলে দেশে যেমন ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত হবে, নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃজন হবে, আয় বৈষম্য কমবে, তেমনি গ্রাম ও শহরের মাঝে সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান হ্রাস পাবে। বর্তমান সরকারের অন্যতম ভিশন ‘আমার গ্রাম আমার শহর’-এর লক্ষ্যও অর্জিত হবে।
আমরা অনেক দিন ধরে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে প্রাণপাত করছি, কিন্তু নাগরিকদের এখনো সেইভাবে সরকারি পর্যায়ে ডিজিটাল সুবিধা দিতে পারছি না। করোনা আমাদের এই সুবিধার প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। এখনো অনেক সরকারি অফিসে ডিজিটাল পণ্য ডেলিভারি শুধু জিপি ফান্ড থেকে অর্থ উত্তোলনের মঞ্জুরিপত্র এবং কর্মচারীদের ছুটির পত্র জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ; ডিজিটাল পদ্ধতিতে সব নাগরিক-সেবা প্রদান এখনো সুদূর পরাহত। এই সেবা প্রদান পদ্ধতি সামগ্রিকতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারলে এই লকডাউন সময়ে অফিসে না গিয়েও অফিস পরিচালনা ও নাগরিক সেবা প্রদান স্বাচ্ছন্দ্যে সম্পাদন করা যেত এবং তাতে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির মাত্রাও সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসত। সেবাদান পদ্ধতির দ্রুত উন্নয়নে এখন যারা ডিজিটাল ব্যবস্থায় পারঙ্গমতার পরিচয় দিচ্ছেন, তাদের বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা দরকার; বাকিদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন না করতে পারলে বিকর্ষণমূলক ব্যবস্থার আওতায় নেওয়া যেতে পারে।
আমাদের দেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ প্রবাসে কাজ করে দেশে অর্থ প্রেরণ করেন। তাদের একটা অংশ এখন বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। এদের কাছে যেমন আছে কিছু পুঁজি, তেমনি আছে তাদের অনেক অভিজ্ঞতা এবং কিছু দক্ষতা। দেশের অভ্যন্তরে এবং বাহিরে বাঙালিরা কৃষিকাজে, বিশেষ করে শাক-সবজি উৎপাদন ও মৎস্যচাষ, হাঁস-মুরগি ও পশুপালনে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এই মুহূর্তে বিদেশে এই সব বিকল্প কর্মক্ষেত্রে তাদের নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ তৎপরতা চালানো প্রয়োজন; এ কাজ শুধু দুই একটি টেলিফোন করা বা পত্রলেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আফ্রিকার অনেক দেশের অকর্ষিত বিরান ভূমি হতে পারে কৃষি উৎপাদনে আমাদের নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র। কিছুটা আমাদের মতো বিষুবীয় জলবায়ুর এই সব দেশে আমাদের সেনাবাহিনী নিরাপত্তা সেবা দিয়ে ইতিমধ্যে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে। কাজেই সেখানে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশ সহজ হতে পারে। ইউরোপ আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বর্ধিত স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা মেটাতে আমাদের পরিষেবিকা ও জেরিয়াট্রিসিয়ানরা (geriatrician) বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ কাজগুলো উভয় দেশের জন্য জয়জয়কার (win win situation) অবস্থা তৈরি করতে পারে। তবে এর জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে অঙ্গীকারমূলক কর্মতৎপরতা দরকার।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের উভয় জল-সীমান্তে সুমদ্র জয় করে বসে আছি; কিন্তু সেখানে কোনো কাজ করছি না। অথচ এটা হতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক বিরাট চারণক্ষেত্র। মালদ্বীপ আমাদের চেয়ে অধিক মাথাপিছু আয়ের দেশ। তার জাতীয় আয়ের প্রায় ১৫ ভাগ আসে সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ থেকে। আমাদের সমুদ্র প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ সমৃদ্ধ এক ভাণ্ডার। গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে এই সম্পদের আরও উন্নয়ন সাধন করা যেতে পারে। এটা মন্থন করে সেখান থেকে আহরিত অমৃত আমরা আমাদের জীবন-মানের উন্নয়ন সাধনে কাজে লাগাতে পারি। এই কঠিন সময়ে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার সম্পদ আহরণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
লেখক
খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক
