ইলিশের নাগাল না পেয়ে হতাশ চাঁদপুরের জেলেরা

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২০, ০১:৪৮ পিএম

শুরু হয়েছে ইলিশের মৌসুম। কিন্তু ইলিশের রাজধানী খ্যাত চাঁদপুরের জেলেদের জালে ধরা দিচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত রূপালী ইলিশ। জালে যেই পরিমাণে মাছ উঠছে তাতে খরচের টাকাই হচ্ছে না। এতে করে আর্থিক সংকটে পড়ে হতাশায় ভুগছেন জেলার অর্ধ লাখ জেলে।

ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা বলছেন, করোনা মহামারীতে প্রশাসন ঠিকমত নদীতে নজরদারি করতে পারেনি। তাই এ বছর জাটকার মৌসুমে নির্বিচারে নিধন করার ফলে ইলিশের উৎপাদন কমেছে।

যদিও ইলিশ গবেষকের দাবি, আর কিছু দিন পরেই পাল্টে যাবে চিত্র। জেলেদের জালে ধরা পড়বে ঝাঁকে ঝাঁকে রূপালী ইলিশ।

চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর ইউনিয়নের গোবিন্দা গ্রামের জেলে আলী দিদার।

চল্লিশোর্ধ্ব এই জেলে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে নদীতে ইলিশ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

বিগত সময়ে নদীতে ইলিশের সংকট দেখা দিলেও এ বছরের মতো সময় আর আসেনি তার জীবনে। মৌসুম শুরু হলেও জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না বললেই চলে। ৩ ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে সংসারের চাকা ঘুরছে না আর তার।

জেলে আলী দিদার বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে আমরা অনেক আর্থিক সংকটে ভুগছি। এর মধ্যে জাল নিয়ে নদীতে নামলেও ইলিশের দেখা পাচ্ছি না। সারাদিন জাল বেয়ে যেই পরিমাণে মাছ পাওয়া যায় তা দিয়ে নৌকার জ্বালানি খরচ উঠাতে কষ্ট হয়ে যায়। সংসারের খরচ বহন করতে গিয়ে ধার-দেনা বেড়ে চলছে আমাদের।

আলী দিদারের মতোই কষ্টে দিন পাড় করছেন চাঁদপুরের অর্ধলক্ষাধিক জেলে।

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ইলিশের ভর মৌসুম। প্রতি বছর এই সময়ে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় ইলিশ ধরার উৎসবে মেতে উঠে জেলেরা।

চাঁদপুর সদর উপজেলার হানারচর, লক্ষ্মীপুর এলাকার জেলেরা জানান, জাল ফেলেও ইলিশের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় শূন্য হাতে জাল-নৌকা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে তাদের। গত জাটকা মৌসুমে অসাধু জেলে কর্তৃক অবাধে জাটকা নিধনের ফলে ইলিশের উৎপাদন কমেছে বলে মনে করছেন তারা।

নদীর পাড়ের আড়তগুলোতে ঘুরে দেখা যায, অনেকটা অলস সময় কাটছে আড়তদারদের। জেলেদের জালে ইলিশ না পড়ায় মাছের আড়তগুলোতে মাছের আমদানি অনেক কম।

হরিনা ফেরি ঘাট এলাকার আড়তদার মো. মোহসীন ও বিল্লাল গাজী বলেন, মহামারি করোনার কারণে জাটকা রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন নদীতে সঠিকভাবে তদারকি করতে পারেনি। এই সুযোগে অসাধু জেলেরা নির্বিচানে নিধন করেছে জাটকা। ফলে ভর মৌসুমে ইলিশের দেখা মিলছে না নদীতে।

তারা বলেন, ইলিশ ধরা কম পড়ায় দামও অনেক বেশি। বর্তমানে স্থানীয় নদীর এক কেজি ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ১১শ’ থেকে ১২শ’ টাকা এবং ৭শ’ থেকে ৮শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৮শ’ থেকে ৯শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শবে বরাত বলেন, চাঁদপুরের নদীতে ইলিশ না পড়ায় স্থানীয় জেলেরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সরকারিভাবে যেই সহায়তা করা হয়েছে তা অপ্রতুল। করোনার এই মহামারিকালে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা তাদের সাধ্যমত জেলেদের সহায়তা করার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, চাঁদপুরে ইলিশ ধরা না পড়লেও দক্ষিণাঞ্চলে ইলিশ পাচ্ছে জেলেরা।

বরিশাল, ভোলা, বরগুনা থেকে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে দেড় হাজার মণ ইলিশ আসে চাঁদপুর চাঁদপুর বড়স্টেশন  মাছ ঘাটে।

এসব ইলিশের স্বাদ কিছুটা কম হওয়ায় দামেও সস্তা। ৬শ’ থেকে ৭শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি সাড়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা এবং ৪শ’ গ্রামের নিচের ইলিশ কেজি প্রতি ৩শ’ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

এসব ইলিশ ঢাকাসহ, যশোর, কুষ্টিয়া, রংপুর, পাবনা, নাটোর, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মনবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হয়।

তবে আশার কথা শুনিয়েছেন চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানীক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. মো. আনিসুর রহমান।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ ঘরবন্দি থাকায় নদী দূষণ অনেকটাই কমে এসেছে। এর প্রভাবে নদীর পানির গুণাগুণ আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর স্রোতধারা বৃদ্ধি ও বেশি বৃষ্টিপাত হলে জেলেরা ইলিশ পাবে। অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও দেশে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত