রিজেন্ট হাসপাতালের অপরাধীদের গ্রেপ্তার করেছি

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২০, ০৫:৫৭ এএম

রিজেন্ট হাসপাতালে জালিয়াতিতে জড়িতদের সরকারের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সাংসদ হারুনুর রশীদ রিজেন্ট হাসপাতালের নানা দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরলে এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। এ ছাড়া মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরের সাংসদ কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল দেশটির নাগরিকত্ব নিয়ে থাকলে তার  সদস্য পদ বাতিল হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপির সাংসদ হারুন তার বক্তব্যে রিজেন্ট হাসপাতালের ‘অনিয়ম ও দুর্নীতি’ এবং করোনা পরিস্থিতিতে ৫০ লাখ পরিবারকে সরকারের দেওয়া সহায়তার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য তুলে ধরেন।

জবাবে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, ‘যে তথ্যগুলো পত্রিকা লিখেছে, আপনি তিনটা বিষয় উল্লেখ করেছেন। তিনটি বিষয়েই কিন্তু ধরেছে আমাদের সরকারই। বিরোধী দলের সদস্যরা বলেননি, আমরাই ধরেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অপরাধীদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছি। মাননীয় সংসদ সদস্য, এ তথ্যটা আগেভাগে জানাতে পারলে আমরা খুশি হতাম। এই তথ্যটা অন্য কেউ কিন্তু জানায়নি। আমরা সরকারের পক্ষ থেকেই এটা খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিয়েছি। সেখানে র‌্যাব গিয়েছে। এসব খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৫০ লাখ পরিবারকে সহায়তার জন্য তালিকা হয়েছে। সেই তালিকা তিন দফা যাচাই করা হচ্ছে। সেটা যাচাই-বাছাই করে তারপর কিন্তু আমরা যথাযথ, মানে যে পাওয়ার যোগ্য, সরাসরি তার কাছে টাকাটা পৌঁছে দিচ্ছি। হয় তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে, না হয় তার অ্যাকাউন্টে। যাচাই করতে সময়ও নিয়েছি। এখানে অন্য যে নামধাম আসছে, সেগুলো আমরা কেটেছেঁটে ফেলে দিচ্ছি।’

কুয়েতের নাগরিকত্ব থাকলে পাপুলের এমপি পদ বাতিল : মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরের সাংসদ কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল সেই দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে থাকলে তার সদস্য পদ বাতিল হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সে কুয়েতের নাগরিক কি না, সেটা কিন্তু কুয়েতের সঙ্গে আমরা কথা বলছি, সেটা দেখব। আর যদি এটা হয়, তাহলে তার ওই সিট হয়তো খালি করিয়ে দিতে হবে। কারণ যেটা আইনে আছে সেটা হবে। তার বিরুদ্ধে আমরা এখানেও তদন্ত করছি।’

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সাংসদ পাপুলকে গত ৬ জুন রাতে কুয়েতের মুশরিফ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। মারাফি কুয়েতিয়া কোম্পানির অন্যতম মালিক পাপুলের সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি রয়েছে। পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে পাপুলের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ এনেছে কুয়েতি প্রসিকিউশন। সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কুয়েত গিয়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়া পাপুল ২০১৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সাংসদ নির্বাচিত হন। শুধু তা-ই নয়, নিজের স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও সংরক্ষিত আসনে সাংসদ করে আনেন তিনি। প্রবাসী উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকেও পাপুলের বড় অঙ্কের শেয়ার রয়েছে। কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে ওই ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পাপুল ও তার কোম্পানির ব্যাংক হিসাব ইতিমধ্যে জব্দ করেছে কুয়েত কর্তৃৃপক্ষ। বাংলাদেশেও তার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে গতকাল বিএনপির সাংসদ হারুনুর রশীদ কুয়েতে পাপুলের গ্রেপ্তার হওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি পাপুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান।

তার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সে (পাপুল) কিন্তু স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। সে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আমাদের (আওয়ামী লীগের) নমিনেশন চেয়েছিল, আমি দিইনি। কিন্তু সে স্বতন্ত্র ইলেকশন করেছে। ওই সিটটি আমরা জাতীয় পার্টিকে দিয়ে দিয়েছিলাম। জাতীয় পার্টির নোমান (মোহাম্মদ নোমান) নমিনেশন পেয়েছিলেন, কিন্তু নির্বাচন করেননি। সেখানে ওই লোক (পাপুল) জিতে আসেন। আবার তার ওয়াইফকেও যেভাবে হোক (সংরক্ষিত আসনের) এমপি বানায়। কাজেই এটা কিন্তু আমাদের করা না।’

পাচারে কারা, দেখা দরকার : মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সোনার হরিণের স্বপ্ন দেখিয়ে কারা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে, সেটা ভালোভাবে দেখা দরকার। সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদের একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এদিন সংসদে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘যখনই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, সরকার তদন্ত করে সেই সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে ধরছে, যথাযথ ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি, মাননীয় সংসদ সদস্য একটা সঠিক কথাই বলেছেন যে এটা ভালোভাবে দেখা দরকার কারা এভাবে ভুলিয়ে-ভালিয়ে মানুষগুলোকে সেই সোনার হরিণের স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে যায় আর তারপরে বিপদে ফেলে বা তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয়। সেটা আসলে করা উচিত।’

একই সঙ্গে দেশের মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এত সুযোগ রয়েছে, প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের ডিজিটাল সেন্টার। তার মাধ্যমে তারা সেখানে নিজেরা নিবন্ধন করতে পারেন এবং সেই নিবন্ধন করার পর যখন যেখানে কাজের সুযোগ আসে, সঙ্গে সঙ্গে ওই নিবন্ধিতদের কিন্তু আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। নিবন্ধিত কর্মীরা যখন বৈধভাবে বিদেশে যায়, তখন তাদের চাকরির নিরাপত্তা, বেতনের নিরাপত্তা সবই থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্য, তারপরও মানুষ এ ধরনের এজেন্টদের খপ্পরে পড়ে, দালালদের খপ্পরে পড়ে। তারপর তারা লাখ লাখ টাকা দিয়ে গিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। ওরা নিয়ে গিয়ে কিন্তু আবার তাদের জিম্মি করে, ওদের টর্চার করে, মারে, রেকর্ড শোনায়, আবার টাকা দাবি করে। তাদের আবার এজেন্ট থাকে, তারা টাকা নেয়।’

দেশবাসীকে তাদের ব্যাপারে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রবাসে যারা কাজ করেন, আমাদের অর্থনীতিতে তাদের অবদান আছে। কাজেই সেদিক থেকে আমরা তাদের গুরুত্ব দিই এবং সে জন্য তাদের নিরাপত্তার তাগিদ আমাদের থাকে।’

বঙ্গবন্ধুর খাতার কথা বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখার খাতার কথা বলতে গিয়ে সংসদে এদিন আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কারাগারে কী ধরনের যন্ত্রণায় থাকতেন, তা বাইরে বলতেন না। যা জানতে পেরেছেন, লেখা থেকেই জেনেছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালে তাদের বাসা শুধু আক্রমণই করা হয়নি, দীর্ঘ নয় মাস লুটপাট করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সবকিছু লুট হয়ে যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর লেখার খাতাগুলো কেউ নেয়নি। মনে হয় তাদের পছন্দ হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে বাড়িও লুট হয়। এর পরও তিনি খাতাগুলো উদ্ধার করেছেন।

বাবার লেখা খাতার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে চোখ মোছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বাবা যখন কুর্মিটোলা কারাগারে, ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন, তখন মা সব সময় একটা খাতা দিয়ে আসতেন লিখে রাখার জন্য। আমি গেলে আমাকে বাবা লেখা খাতাটা দিয়ে দিতেন। বলতেন, এখন খাতাটা পড়বি না। যখন আমি থাকব না, তখন পড়িস। এরপর আর খাতাগুলো ধরিনি।’

বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারাজীবনের কষ্ট যন্ত্রণা কিচ্ছু বলেননি আব্বা। যতটুকু জেনেছি এই লেখা পড়ে। তিনি নিজে থেকে বলতে চাইতেন না। রেহানাকে (শেখ রেহানা) জিজ্ঞেস করেছি, তুই কিছু শুনেছিস? ও ছোট ছিল, মাঝেমধ্যে আব্বার কাছে জানতে চাইত। সেদিনও ওকে জিজ্ঞেস করেছি। ও বলল, বাবা বলতেন, তোরা এগুলো জানলে সহ্য করতে পারবি না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৬৫-৭৭ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিক্লাসিফাইট ডকুমেন্ট পুরোটাই সংগ্রহ করা হয়েছে। এ থেকে হয়তো কিছু জানা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘এগুলো হার্ডডিস্কে ছিল। এখন সেগুলো প্রিন্ট নেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাসের সময় ধীরে ধীরে দেখছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত