উত্তরা বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আহসানউল্লাহ। দীর্ঘদিন ধরেই সুনামের সঙ্গে তিনি চাকরি করে আসছেন। বছর চারেক আগে তার হাসপাতাল থেকে রোগী না দেওয়ার ‘অপরাধে’ উত্তরা পশ্চিম থানায় নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দেন রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ। আর এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেন থানার তৎকালীন সেকেন্ড অফিসার এসআই মামুন। নামিদামি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগাতে না পারলেই সংশ্লিষ্টদের টার্গেট করে আহসানউল্লাহর মতোই তরুণীদের দিয়ে মামলা দেওয়া হতো। আর এসব প্রতিটি কাজেই সাহেদকে সহযোগিতা করত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় অসাধু সদস্য। নানা অনিয়ম করেও হাসপাতালের কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে থানা পুলিশকে প্রতিমাসে ৫০ হাজার টাকা করে মাসোহারা দিয়ে আসছিল রিজেন্ট গ্রুপ। রিজেন্ট গ্রুপের সাবেক চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য মিলেছে।
এদিকে উত্তরা ও মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতালে নানা অজুহাতে অর্ধশত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মারধর করে বিভিন্ন ধরনের মামলা দিয়ে চাকরিচ্যুত করেছেন প্রতারক সাহেদ। তাদের কারও কাছ থেকে আবার অর্থও আদায় করা হতো। আর এসব অপকর্ম করতে সাহেদ ব্যবহার করতেন কিছু রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও গণমাধ্যম কর্মীদের। এমনকি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হাসপাতালের ভবনের ভাড়াও নিয়মিত পরিশোধ করা হতো না। এখনো ভবন মালিক ১৬ লাখ টাকা পান সাহেদের কাছে। পাওনা টাকার জন্য তাগাদা দেওয়ায় কয়েকবার ভবন মালিককে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১০ সালে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডের ৩৮ নম্বর বাড়ি ভাড়া নিয়ে রিজেন্ট হাসপাতাল গড়ে তোলেন সাহেদ। এই বাড়ির মালিক সেনাবাহিনীর সাবেক এক মেজর। তিনি বারিধারা ডিওএইচএসে থাকেন। শর্ত অনুযায়ী হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ কথা রাখেননি। মাসিক ভাড়া ছিল ৭৬ হাজার টাকা। কিন্তু নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করা হতো না। এই নিয়ে মালিকের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। এখনো বাড়ির মালিক প্রায় ১৬ লাখ টাকা পাবেন। টাকা চাইলে তাকেও নানাভাবে হুমকি দেওয়া হতো। মালিককে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে কাবু করে রাখতেন সাহেদ। হাসপাতালের রোগী বাগাতে ঢাকাসহ আশপাশের নামিদামি হাসপাতালগুলোকে টার্গেট করতেন তিনি। আর এই কারণে দালাল নিয়োগ দিয়েছেন প্রায় সব হাসপাতালেই। পাশাপাশি রিজেন্ট হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরও রোগী বাগিয়ে আনার দায়িত্ব ছিল। তাছাড়া ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলো থেকেও রোগী বাগিয়ে আনা হতো। নির্দিষ্ট হারে রোগী বাগিয়ে আনতে না পারলে নিজের অধীনস্থ কিছু নারী দিয়ে ধর্ষণসহ অন্যান্য মিথ্যা মামলা দিয়ে নানা কায়দায় নির্যাতন চালাতেন। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন সাহেদ। তার ভয়ে কেউ কথা বলার সাহস পেত না।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের সাবেক এক চিকিসৎক দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকায় যত নামিদামি হাসপাতাল আছে সেখান থেকে রোগী বাগিয়ে আনা হতো রিজেন্ট হাসপাতালে। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়, ল্যাবএইড হসপিটাল, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, সৈয়দ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, ইবনে সিনা হসপিটাল, টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল, গাজীপুর তাজউদ্দীন আহমদ সরকারি হাসপাতাল, ময়মনসিংহ সরকারি হাসপাতাল, কুমিল্লা সরকারি হাসপাতাল, জামালপুর সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে আনা হয়। এজন্য ওইসব হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তাকে নিয়মিত অর্থ দেওয়া হতো।
রিজেন্ট হাসপাতালের ওই চিকিসৎক বলেন, ‘বছরখানেক আগে দুই প্রশাসনিক কর্মকর্তার টঙ্গী ও ময়মনসিংহ হাসপাতাল থেকে ১০ জন রোগী আনার কথা ছিল। কিন্তু তারা আনতে পারেননি। আর এই কারণে ওই কর্মকর্তাদের মারধর করে নারী দিয়ে ধর্ষণের মিথ্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হয় টঙ্গী থানায়। এমনকি আমার বিরুদ্ধেও মামলা দিতে চেয়েছিল। আমার বেতন দেওয়ার কথা ছিল ৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু এক মাস পরেই সাহেদ আমাকে জানায়, আপনার বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। প্রতিবাদ করলে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে তিনি আমার গালে থাপ্পড় মেরে বসেন। পরে আমি চাকরি ছেড়ে দিই। উত্তরা ও মিরপুরে দুটি হসপিটালেই চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের ওপর নির্যাতন করা হয়। আমার জানা মতে, অন্তত অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনসহ অন্যান্য মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে সাহেদ।’
সাহেদের নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকে চাকরি ছেড়ে পালিয়ে চলে গিয়েছে জানিয়ে এই ভুক্তভোগী আরও বলেন, ‘গত ডিসেম্বরে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের এক ডাক্তার রিজেন্ট হাসপাতালে রোগী না দেওয়ায় নারী নির্যাতন মামলা করে সাহেদ। পরে ওই ডাক্তার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালে সাহেদ মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়।’
রিজেন্ট হাসপাতালের সাবেক কর্মকর্তা সোহাগ আরেফিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন কোনো অপকর্ম নেই যে সাহেদ করেননি। তার সঙ্গে প্রায় চার বছর চাকরি করেছি। তার অনেক অপকর্ম নিজ চোখে দেখেছি। হাসপাতালটি ব্যবহার করে সে নানা কায়দায় প্রতারণা করেছে। বিভিন্ন নামি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে আনা হতো। আর না আনতে পারলেই সুন্দরী নারীদের দিয়ে মামলা ঠুকে দিয়ে নানাভাবে হয়রানি চালাত। সবাইকে প্রশাসনের ভয় দেখাত।’
তিনি আরও বলেন, ‘মিরপুর ও উত্তরায় অন্তত দুই ডজন তরুণীকে সাহেদ লালন-পালন করে। তাদের নিয়ে সাহেদসহ তার সাঙ্গোপাঙ্গরা আনন্দ ফুর্তি করে। কয়েক বছর আগে তার কথামতো রোগী আনতে না পারায় আমাকে মারধর করে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি প্রতারণা মামলা দেয় আমাকেসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামে। আমি নাকি তার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছি। প্রথমে পুলিশ মামলা নিতে চায়নি। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অ্যাডিশনাল আইজিপির নির্দেশ পুলিশ মামলা নেয়। আমার মতো অনেককে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে সাহেদ। নারীদের মধ্যে মুমু ও মাইজিয়া ইসলাম মৌ বেশি নাজেহাল করেছে সবাইকে। এই রকম হাজারো অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।’
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মো. আশিক বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদের নানা প্রতারণা তথ্য প্রতিদিনই পাচ্ছি। যারা হয়রানির শিকার হয়েছেন তাদের অভিযোগ পাচ্ছি। সাহেদকে ধরতে নজরদারি কয়েক ধাপ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুতই তাকে ধরা সম্ভব হবে।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলছেন, সাহেদ আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে তিনি দেশেই আছেন। বিদেশে পালিয়ে যেতে পারবেন না। পুলিশ ও র্যাব অনুসন্ধান করছে। তার স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া তার সহযোগীদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রতারক সাহেদ করিম বিভিন্ন সময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে দেখা করে ছবি তুলতেন। এসব ছবি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গাতে ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা আদায় ও প্রতারণা করতেন।
তদন্তকারী দলের এক কর্মকর্তা জানান, সাহেদ দেশত্যাগ করতে পারে, এমন শঙ্কা ছিল। রিমান্ডে থাকা আসামিদের থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত শনিবার রাতে আবারও অভিযান চালানো হয় রিজেন্ট হাসপাতালে। সেখান থেকে সাহেদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। এখন অন্তত সাহেদ কোনো এয়ারপোর্ট বা বন্দর হয়ে দেশত্যাগ করতে পারবে না।
এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযানকালে আমরা রিজেন্ট কার্যালয়ের রান্নাঘর থেকে কম্পিউটারের তিনটি হার্ডডিস্ক জব্দ করেছি। এর মধ্যে সাহেদের ল্যাপটপের হার্ডডিস্কও রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ধরা পড়ার শঙ্কায় এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথি গায়েব করার উদ্দেশে হার্ডডিস্কগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। আমরা হার্ডডিস্ক বিশ্লেষণ করব, ফাইল ডিলিট করা হলে সেগুলো উদ্ধার করে খতিয়ে দেখা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বালু-পাথরের ব্যবসা করতে গিয়েও প্রতারণা করেছেন সাহেদ। সেই অর্থ প্রতারণার দায়ে মামলাও হয়েছে তার বিরুদ্ধে। সিলেটের জৈন্তাপুরের ব্যবসায়ী শামসুল মাওলার কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকার মালামাল নেওয়ার পর পরিশোধ করেন মাত্র ২ লাখ। বাকি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য চেক দেন। কিন্তু ব্যাংকে চেক বাউন্স হওয়ার পর ওই ব্যবসায়ী মামলা করেছেন। সেটিও তদন্ত চলছিল। এ রকম অর্ধশত ভুক্তভোগী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ আমরা আমলে নিচ্ছি।’
সাহেদের অনিয়মের তদন্ত করছে এমন একটি সংস্থা জানায়, সাহেদ করিমের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে ১০ হাজারের বেশি করোনাভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি করেছিল করোনা আক্রান্ত রোগীদের বিনা খরচে চিকিৎসা দেবে বলে। কিন্তু তারা রোগীর কাছ থেকে জোর করে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছে। এসব প্রতারণার মূলে রয়েছে গ্রুপটির চেয়ারম্যান সাহেদ করিম।
গত ৬ জুলাই নানা অনিয়ম, প্রতারণা, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ, করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট ও সার্টিফিকেট দেওয়া এবং রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে রিজেন্ট গ্রুপের দুটি হাসপাতালে অভিযান চালায় র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। অভিযানে গিয়ে প্রতারণার সত্যতা মেলে, সেই সঙ্গে পাওয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য। পরদিন ৭ জুলাই মঙ্গলবার রিজেন্ট গ্রুপের মূল কার্যালয় এবং রাজধানীর উত্তরা ও মিরপুরের দুটি হাসপাতাল সিলগালা করে দেওয়া হয়।
