মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯২০’ প্রণয়নের প্রেক্ষাপট

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২০, ০৭:৪৭ এএম

প্রাকৃতিক সম্পদে স্বয়ম্ভর হয়েও ভারতে ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ববাংলা ছিল শিক্ষা-দীক্ষা থেকে চাকরি এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যে নানাভাবে অবহেলিত, বঞ্চিত। ১৯০৫ সালে বঙ্গ বিভাগের ফলে পূর্ববঙ্গের রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একই সঙ্গে আসাম ও পূর্ববঙ্গের জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অধিকতর স্বায়ত্তশাসন লাভের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বঙ্গভঙ্গের ফলে কলকাতা-কেন্দ্রিকতার স্বার্থমূলে আঘাত আসে, এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ সূচিত হয়। স্বদেশি আন্দোলনে মেতে ওঠে বাংলার বিভাগবিরোধীরা। তীব্র আন্দোলন ও প্রতিরোধের মুখে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের সরকার দরবার দিবসে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে। এ ঘোষণায় পূর্ববঙ্গের জনগণ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায় নিদারুণ আশাহত হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে অন্য নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে নবাব খাজা সলিমুল্লাহ (১৮৭১-১৯১৫) বঙ্গভঙ্গ রদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে ১৭ এবং ২০ ডিসেম্বর তারিখে দুটি হাতের লেখা চিঠি পাঠান ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে। ২০ তারিখের চিঠিতে খাজা সলিমুল্লাহ পূর্ববাংলার সংখ্যাগুরু মুসলমানদের সার্বিক উন্নতিবিধানকল্পে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু সংস্কার প্রস্তাব রাখেন। তিনি পত্রের শেষাংশে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ ও আলোচনার জন্য ভাইসরয়ের সাক্ষাৎ প্রার্থনাও করেন। পত্র পাওয়ার পরদিনই [২১ ডিসেম্বর] ভাইসরয় তার উপদেষ্টা পর্ষদের শিক্ষা সদস্য স্যার এইচ বাটলার সাহেবকে নবাবের পত্রের প্রস্তাবাবলি সম্পর্কে তার অভিমত জানতে চেয়ে নোট দেন। এই নোটে ভাইসরয় তার পর্ষদের কাছে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অভিমত রাখেন, তার উপলব্ধি ছিল এই উদ্যোগকে পূর্ববঙ্গবাসী স্বাগত জানাবে এবং এর ফলে পূর্ববঙ্গের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বার্থসংরক্ষণের পথে একটি অগ্রগতি সাধিত হবে।

৩১ জানুয়ারি ১৯১২ তারিখে ভাইসরয় হার্ডিঞ্জের ঢাকা সফরের সময় তার সঙ্গে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতাদের ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। তাদের পেশ করা বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভাইসরয় তাদের ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাটি প্রথম অবহিত করেন। প্রতিনিধিদলের সাক্ষাতের এক দিন পরই ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ সরকার অফিশিয়াল কমুনিকের মাধ্যমে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণায় তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ, বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, হিন্দু জমিদার এবং স্টেটসম্যান ও বেঙ্গলি পত্রিকা। ১২ ফেব্রুয়ারি প্রখ্যাত আইনজীবী ড. রাশবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে ১০ সদসের একটি প্রতিনিধিদল ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আপত্তি উত্থাপন করেন। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এর ফলে বঙ্গভঙ্গ রদের সুফল ব্যর্থ হবে।

এসব প্রতিবাদ সত্ত্বেও বাংলা সরকার আগের সিদ্ধান্তে অটল থাকে, ১৯১২ সালের ২৭ মে তারিখে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন কল্পে রেজল্যুশন জারি করে এবং ব্যারিস্টার নাথানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন স্কিম প্রণয়নের জন্য কমিটি গঠন করে। কমিটি ২৪ ডিসেম্বর, ১৯১২ তারিখে রিপোর্ট দাখিল করে এবং ২৬ ডিসেম্বর সেই রিপোর্টের ওপর সব মহলের মতামত আহ্বান করা হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের প্রভাবশালী সদস্যরা ১ মার্চ ১৯১৩ সিনেটের নবম অধিবেশনে প্রত্যেকে লিখিতভাবে নাথান কমিটির রিপোর্টের বিরূপ সমালোচনা করে। সেক্রেটারি অব স্টেট ডিসেম্বর ১৯১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে নাথান কমিটির রিপোর্ট অনুমোদন করেন। কিন্তু ইতিমধ্যে প্রথম মহাসমর শুরু হয়ে যাওয়ায় ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কার্যক্রম থমকে যায়।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সরকার ১৯১৬ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। ইতিমধ্যে ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠিত হওয়ায় সে উদ্যোগে ভাটা পড়ে। ১৯১৯ সালে কমিশনের রিপোর্ট দাখিল হলে সরকার ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সপক্ষে কমিশনের ইতিবাচক অভিমতসহ সুপারিশ লাভ করলে আর বিলম্ব না করে আসন্ন সেপ্টেম্বরের লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন ১৯১৯ উত্থাপনের পরিকল্পনা জানিয়ে শিক্ষাসচিব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে আগস্ট ১১ তারিখে পত্রযোগে জানায়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আগস্ট ২৩,১৯১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত ১১তম সিনেট সভায় ‘কমিশনের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট বিচার বিশ্লেষণের সুযোগ না দিয়েই ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আইনপ্রণয়নে সরকারি উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা’ করা হয় এবং সিনেট সভার সম্পূর্ণ কার্যবিবরণী দিল্লিতে পাঠানো হয় টেলিগ্রাম যোগে। কমিশনের রিপোর্ট বাংলার শিক্ষাব্যবস্থায় সার্বিক সংস্কার ও উন্নয়নকল্পে যে বিশাল প্রতিবেদন প্রণয়ন করে, সেখানে বাংলার মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও সংস্কারকল্পে কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশমালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখতিয়ারে স্কুল-কলেজসমূহের অধিভুক্তির প্রসঙ্গটি উঠে আসে। বলাবাহুল্য, এ বিষয়টিই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আপত্তি ও নেতিবাচক মনোভাবের ভিত্তি, যা হোক সরকার এ ব্যাপারে আগের সিদ্ধান্তে অটল থাকে এবং ১১ সেপ্টেম্বর ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল উত্থাপিত হয়। সরকার সেপ্টেম্বর ২৩,১৯১৯ তারিখের পত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে অবিলম্বে খসড়া আইনের ওপর চূড়ান্ত অভিমত পাঠানোর সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নভেম্বরের ১ তারিখের সিনেটের ১৪তম অধিবেশনে খসড়া আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সংশোধন সংযোজন সুপারিশ করার জন্য উপাচার্যকে প্রধান করে নয় সদস্যের সিনেট কমিটি গঠন করা হয়।

এই বিশেষ কমিটিতে একমাত্র বাঙালি মুসলমান সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন খানবাহাদুর আহছানউল্লা। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে তখনো একমাত্র বাঙালি মুসলমান সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। খসড়া বিল পরীক্ষা পর্যালোচনা কমিটির সদস্য হিসেবে বিলের প্রতিটি অনুচ্ছেদের ধারা-উপধারায় কমিটির অন্য জাঁদরেল সদস্যদের সঙ্গে বাদানুবাদে পূর্ববঙ্গের জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা সংস্কৃতিতে চক্ষুষ্মান হওয়ার স্মারক ও প্রাণবায়ু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিন্ন স্বার্থ ও আইনের আওতায় এই নবীন উচ্চশিক্ষায়তনটির প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তার জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। কমিটির সদস্য হিসেবে বিলের প্রতিটি অনুচ্ছেদ অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও স্বার্থ সংরক্ষরণকল্পে পদে পদে বলিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করেন। কমিটির রিপোর্টে বিধৃত সব মতের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই তিনি একমত হতে পারেননি, সে কারণে ২৭ নভেম্বর ১৯১৯ তারিখে তিনি চার পৃষ্ঠার একটি নোট অব ডিসেন্ট দাখিল করত রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছিলেন। তার নোট অব ডিসেন্টটি কমিটির রিপোর্টের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯১৯ পরীক্ষা ও বিবেচনার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের রিপোর্ট পেশ করলে ডিসেম্বর মাসের ১৭ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত সময়ে সিনেটের বিশেষ অধিবেশনসমূহে কমিটির রিপোর্টের ওপর বিস্তারিত আলোচনা এবং আইনের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও তফসিলের ওপর পর্যালোচনা ও ভোটাভুটির মাধ্যমে সিনেটের সংশোধন প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রসঙ্গত, প্রধান যে বিষয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে, সেটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদ ও কমিটিতে বিশেষ সম্প্রদায়কে বিশেষ প্রতিনিধিত্বদানের প্রসঙ্গ নিয়ে। যেকোনো জাতির বা সম্প্রদায়ের সার্বিক উন্নয়নে রাজনীতির সঙ্গে শিক্ষার সর্বজনীন সম্পৃক্ততার অনিবার্যতা তুলে ধরেন তিনি। খানবাহাদুরের বক্তব্যের পর পুরো সিনেটে নতুন চৈতন্যের উদয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ২৫ অনুচ্ছেদে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপরিবেশে প্রশাসনে ও কারিকুলামে মুসলমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সার্বিক স্বার্থ দেখভালের জন্য  Moslem Advisory Board গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়। কমিটি আইন পর্যালোচনাকালে এটার দেখাদেখি হিন্দুদের জন্যও Hindu Advisory Boardথাকার ব্যাপারে দাবি তোলেন এবং কমিটিতে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে তা গৃহীত হয়।

উদাহরণস্বরূপ আরও বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মূল ৩৪ অনুচ্ছেদে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বলতে Dacca Hall, Muhammadan Hall, and such other Halls as may be prescribed by the Statutes-এর প্রভিশন থাকলেও ১৯ ডিসেম্বর তারিখের সিনেট সভায় খানবাহাদুর আহছানউল্লা ৩৪ অনুচ্ছেদে ‘জগন্নাথ হল’ সংযুক্তির প্রস্তাব করলে তা গৃহীত হয়।

(Report of the Committee appointed by the Senate to consider and Report on the Dacca University Bill, November 1919 Ges University of Calcutta, Minutes of the Senate, 18-20 th Meeting of 1919, pages 548-566) 

মূলত ও মুখ্যত কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়েয়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ১৯২০ সালের ১৮ মার্চ ভারতীয় আইন সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯২০’ পাস হয়, এতে গভর্নর জেনারেল অনুমোদন দেন ২৩ মার্চ। পরের বছর, ১ জুলাই ১৯২১ তারিখে বশ^বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

mazid. muhammad@gmail. com

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত