করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদ দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের অন্যতম সহযোগী মাসুদ পারভেজ গ্রেপ্তার হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজীপুর থেকে তাকে আটক করে র্যাব। মাসুদ পারভেজ রিজেন্ট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে দায়িত্ব পালন করতেন।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতালের অনিয়ম ও প্রতারণার ঘটনায় মালিক সাহেদের সহযোগী হাসপাতালের এমডি মাসুদ পারভেজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। র্যাবের করা মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি।’
করোনা পরীক্ষা না করেই ফলাফল দেওয়া এবং লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে গত ৬ জুলাই রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র্যাব। এর একদিন পর ৭ জুলাই রাতে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করে র্যাব এবং উত্তরা ও মিরপুরে হাসপাতালটির দুটি শাখা সিলগালা করে দেওয়া হয়। ওই মামলায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. সাহেদসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়।
এরমধ্যে রিজেন্ট চেয়ারম্যান সাহেদসহ নয়জনকে পলাতক হিসেবে এজাহারে দেখানো হয়েছিল।
মৌলভীবাজারে খোঁজ মেলেনি সাহেদের : রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের আত্মগোপন করা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে ঢাকাসহ সারা দেশে। অপরাধ জগতের দাগি অপরাধীদের সহজেই কাবু করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। কিন্তু সাহেদের বেলায় ঘটছে ব্যতিক্রম। নানা কৌশল নিয়েও তাকে বাগে আনতে পারছে না। সাহেদের পাশাপাশি তার গানম্যান ও অস্ত্রেরও সন্ধান নেই। তবে র্যাব-পুলিশ সাহেদসহ তাদের ধরতে হন্যে হয়ে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে। ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও এখনো সাহেদকে ধরতে না পারায় নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে।
সাহেদ মৌলভীবাজারে অবস্থান করছেন এমন তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত সোমবার রাতভর তৎপর ছিল জেলার সীমান্ত এলাকায়। সাহেদের ফোন ট্র্যাক করে তার খোঁজে জেলাজুড়ে তল্লাশি চালায় র্যাব ও পুলিশ। তবে সাহেদের কোনো খোঁজ মেলেনি। জেলার সব সীমান্তে চেকপোস্ট, রিসোর্ট ও হোটেল-মোটেলে বিশেষ নজরদারি রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। কমলগঞ্জ থানার একজন কর্মকর্তা জানান, মৌলভীবাজার জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে, ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালের করোনা কেলেঙ্কারি ঘটনার পলাতক প্রধান আসামি সাহেদ এ পথে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর সীমান্তপথে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কৈইলাশহরে যেতে পারেন এমন সংবাদ রয়েছে। তাই সতর্কতাস্বরূপ যানবাহনে তল্লাশি করা হয়।
গতকাল র্যাব সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, সাহেদসহ তার অন্য সহযোগীরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন এজন্য দেশের অভ্যন্তরসহ সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘যে কোনো সময় সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হবে। পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে সারা দেশের পাশাপাশি সীমান্তেও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে, যাতে কোনোভাবেই সাহেদ দেশত্যাগ না করতে পারেন। একটি বিষয় স্পষ্ট করে সবাইকে জানাতে চাই, সাহেদের পাসপোর্ট আমাদের কাছে। আমরা জব্দ করেছি। তিনি যদি দেশত্যাগ করতে চান, তাহলে সেটা তার জন্য অবৈধ পন্থা হবে। তিনি যাতে কোনোভাবেই দেশত্যাগ না করতে পারেন, সেজন্য আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ রয়েছে। র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাহেদ গানম্যান নিয়ে চলাফেরা করতেন। আমরা তার গানম্যান ও তাদের অস্ত্রের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি। তার ৫ থেকে ৭ জনের গানম্যানের দল ছিল। তাদের সম্পর্কে অভিযোগ পেয়েছি। তাদের অস্ত্রের উৎস ও অস্ত্রেও বৈধতা খতিয়ে দেখছি।’
রিজেন্ট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েও জাল সার্টিফিকেট : রিজেন্ট কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের জাল সনদ দেওয়া হতো বলে র্যাবের কাছে অভিযোগ এসেছে। র্যাবের পরিচালক আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এতে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে। যে সনদগুলো শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে তা জাল। এই সনদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যক্তিজীবন ও শিক্ষাজীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।’
বিদেশিদের করোনা চিকিৎসার তালিকায়ও ছিল রিজেন্ট হাসপাতাল : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে বিদেশি কূটনীতিক ও নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য সরকার থেকে চারটি হাসপাতাল নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ছিল সরকারি আর দুটি বেসরকারি হাসপাতাল। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে ছিল আলোচিত মো. সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতাল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রভাব খাটিয়ে সাহেদ বিদেশিদের করোনা চিকিৎসার জন্য রিজেন্ট হাসপাতালকে তালিকাভুক্ত করে বলে জানা গেছে।
