করোনাকালের হজ

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২০, ০৬:৪২ এএম

লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা, লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক।

এ এমনই এক প্রেমধ্বনি যে ধ্বনিতে তরঙ্গায়িত হয়ে ওঠে কাবার চারপাশ। শুধুই কি কাবা? এ ধ্বনি ছড়িয়ে যায় বিশ্বজগতের প্রতিটি প্রান্তে। এ এমনই এক ধ্বনি, যা সব ধ্বনিকে স্তব্ধ করে প্রাণের গহিনে বুলিয়ে দেয় প্রেম-স্পর্শ। যে স্পর্শের মায়াবী আবেশে টান পড়ে মনপবনে। যে টানে নয়ন ভরে অশ্রু আসে; আসে অসীমের প্রেম। যে প্রেমের উচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ে মহান আল্লাহর আরশের পায়ায়।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে এই প্রেমময় ধ্বনি উচ্চারণ করতে পারবেন না অনেকেই। পারবেন না পবিত্র হজে অংশগ্রহণ করতে। শুধু নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক হাজিই কেবল মহিমান্বিত এই হজে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। কতই না সৌভাগ্যবান তারা, যারা এখন হজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গুনাহমুক্ত হওয়ার তাওফিক পেয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি হজ করে আর তাতে কোনোরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না, তার আগের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮১১)

অপর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘এক ওমরাহ আরেক ওমরাহ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আর হজে মাবরুরের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস :১৭৭৩)

হৃদয়ের কাবা ও নয়নের মদিনায় যেতে না পারায় মুমিনের হৃদয় আজ বড়ই দগ্ধ। তাদের দিন কাটে ব্যাকুলতায়। রাত পোহায় চোখের পানিতে। চোখের জলে বুক ভাসিয়ে প্রভুর দরবারে হাত তুলে বলেন, প্রভু হে দয়াময়! যে করেই হোক, তোমার ঘর কাবার সামনে গিয়ে নিজ চোখকে শীতল করার তাওফিক দাও।

পবিত্র কাবা মুমিন হৃদয়ের এমনই এক তীর্থ, যার মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর কোনো বান্দা-বান্দি যদি নিষ্ঠার সঙ্গে মর্যাদাবান এ ঘরে এক রাকাত নামাজ আদায় করেন, তাহলে আল্লাহতায়ালা তাকে এক লাখ রাকাত নামাজের সমান সওয়াব দান করেন।’ শুধু তাই নয়, হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি যথাযথভাবে সাতবার বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করে তার একটি গোলাম আজাদ করার সমান সওয়াব হয়। তাওয়াফের প্রতি কদমে আল্লাহ তার একটি করে গুনাহ মাফ করেন, একটি করে নেকি লেখেন এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৪৪৬২; সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৯৫৯)

তাই হজে যেতে না পারার বেদনায় বিরহী আল্লাহপ্রেমীরা রাত গভীর হলেই কান্নার ঢেউ তুলেন। সেই আকুতিতে রাতের নীরবতা ভেঙে খোদার আরশও কেঁপে ওঠে। তাদের চোখের জলে প্রভুপ্রেমের যে কিশলয়টিতে এখন পাতা বেরুচ্ছে, আশা করি খুব শিগগিরই আল্লাহতায়ালা সেই পাতার ফাঁকে ফাঁকে এমন ফুল ফোটাবেন, যে ফুলের সুবাসে পৃথিবী আবার আগের মতোই সুস্থ ও সুন্দর হয়ে উঠবে। স্বাভাবিক হবে সবকিছু।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হজের নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস আছে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে (ইহরাম বেঁধে) নিজের ওপর হজ অবধারিত করে নেয় সে হজের সময় কোনো অশ্লীল কথা বলবে না, কোনো গুনাহ করবে না এবং ঝগড়া করবে না। তোমরা যা কিছু সৎকর্ম করবে আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৭)

হজের সফর পরকালের সফরেরই নিদর্শন। একজন মৃতকে যেমন তার ছেলেমেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, ঘরবাড়ি সব কিছু ফেলে স্রেফ কাফনের কাপড় পরিধান করে চলে আসতে হয় কবরের ডাকে, অনুরূপ একজন হাজিকেও ইহরাম পরিধান করে মৃতের মতোই স্বজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসতে হয় কাবার পথে। কিন্তু এই উপলব্ধি কয়জনেরই বা জাগে। কবি আফসোস করে বলেছেন, ‘খোদার প্রেমে নেই মনোযোগ/তাওয়াফ নিয়ে ব্যস্ত সবাই/ভুলে গেছে হাজি সকল/কোথায় বিকায় প্রেমের সদাই?

আর আল্লাহতায়ালাও স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে...।’ ( সুরা বাকারা, আয়াত : ১৭৭)

আল্লাহতায়ালা মুমিনদের এ আয়াতে যা বোঝাতে চেয়েছেন, প্রেমময় হলো ইবাদত। ইবাদতের অঙ্গভঙ্গি নয়। হজ এখন আর প্রেমের টানে নয়, স্রেফ নিজেকে হাজি বলে পরিচিত করার জন্য করা হয়। অথচ নবীজি এই হজের সফরে বারবার বলতেন- ‘হে আল্লাহ! এ হজে নিজেকে প্রকাশ ও অন্যকে শোনানোর চেষ্টা থেকে পবিত্র রাখো।’ তাই সবার উচিত লৌকিকতাকে ঝেড়ে ফেলে প্রভুর সান্নিধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে ডাকা। সঙ্গে এই দোয়া করা যে- আল্লাহ যেন আমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দিয়ে পৃথিবীকে সুস্থ করে দেন। স্বচ্ছ করে দেন আমাদের চিন্তা-চেতনাকেও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত