অর্থ হাতিয়ে নিতে ৪ কর্মকর্তাকে কাছে টানে জেকেজি

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২০, ০৬:৩৮ এএম

করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য সরকারি থোক বরাদ্দের অর্থ হাতিয়ে নিতে অনুমোদনের চেয়ে অধিকসংখ্যক নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছিল জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (জেকেজি)। সেই থোক বরাদ্দের অর্থ পাওয়ার জন্য জেকেজি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পাশে টেনেছিল। তাদের দেখিয়েছিল মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়ার লোভ। এই চার কর্মকর্তার মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবসহ দুই কর্মকর্তা ও অধিদপ্তরের দুজন পরিচালক রয়েছেন। করোনা পরীক্ষার জন্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কাছে একটি পিসিআর মেশিনও চেয়েছিলেন জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরী। সেটা না পেয়ে তারা দ্রুত সনদ দেওয়ার জন্য পরীক্ষা না করেই যাদের ৫টির কম উপসর্গ ছিল তাদের নেগেটিভ এবং যাদের ৫ বা তারও বেশি উপসর্গ ছিল তাদের পজিটিভ সনদ দেওয়া শুরু করে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (ডিবি) জেরার মুখে এমন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন রিমান্ডে থাকা জেকেজির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ওরফে সাবরিনা শারমিন হুসাইন ও তার স্বামী আরিফ। করোনা সনদ জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তারা বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় পুলিশ রিমান্ডে আছেন। তাদের মুখোমুখি ও আলাদা জিজ্ঞাসাবাদ করছেন ডিবির তদন্ত কর্মকর্তারা। তদন্ত তদারকি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সাবরিনা ও আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে তারা সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ডা. সাবরিনার ওভাল গ্রুপের কাছ থেকে নেওয়া দুটি চেক পাওয়া গেছে। তার একটি চেক ৫ লাখ টাকার। আরিফ যখন বিপদে পড়ে তখন সাবরিনা নিজেই ওই চেকটি প্রত্যাখ্যান করায়। ডা. সাবরিনা জেকেজি ও ওভাল গ্রুপ থেকে মাসে ৫০ হাজার টাকা করে বেতন নিত। তার প্রমাণও আমরা পেয়েছি।’

এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আরিফকে তালাক দেওয়ার যেসব কথা ডা. সাবরিনা বলছেন সেটা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও তালাকনামাও সাজানো। আমরা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবে সাবরিনার সামনে আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের নানা কৌশল প্রয়োগ করি। তখন সাবরিনা আরিফকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। সে বলে, আরিফ অসুস্থ প্লিজ তাকে একটু রেস্টে থাকতে দেন।’

ফেইসবুকে সাবরিনার খোলামেলা ছবি দেওয়া ও অন্যান্য সম্পর্ক বিষয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। আমরা ওই দিকে যাচ্ছি না। আমরা বরং তার করোনা সনদ জালিয়াতি ও প্রতারণার সঙ্গে আর কারা সম্পৃক্ত সেটা বের করার চেষ্টা করছি।’

মামলার তদন্ত তদারকিতে থাকা অপর একজন ডিবি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবরিনা ও আরিফের লক্ষ্য ছিল থোক বরাদ্দ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া। এজন্য তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবসহ দুই কর্মকর্তা ও অধিদপ্তরের দুজন পরিচালককে ম্যানেজ করেন। ওই চারজনকে বড় অঙ্কের ঘুষ দেওয়ারও প্রস্তাব করেন আরিফ। জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘করোনা সনদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তারা দ্রুত সনদ দেওয়ার চেষ্টা করে। সেজন্য তারা অধিদপ্তরের কাছে একটি পিসিআর মেশিনও চায়। তখন অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত পরিচালক আরিফকে বলেন, এভাবে বেসরকারি সংস্থাকে পিসিআর মেশিন দেওয়ার সুযোগ নেই। তখন আরিফ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নাম বলে ওই অতিরিক্ত পরিচালককে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়।’

জেকেজির জালিয়াতির মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট আরেক ডিবি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াও নানামাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো ক্রস চেক করছি। আইনগত দিক পর্যালোচনা করে প্রাপ্ত তথ্যগুলো সমন্বয় করছি। সেখান থেকে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাব। আরিফ ও সাবরিনা আদালতে ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিতে রাজি হলে আর রিমান্ড চাওয়া হবে না। স্বীকারোক্তি দিতে রাজি না হলে ফের রিমান্ড চাওয়া হবে।’

করোনা পরীক্ষার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে গত ২৩ জুন জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আরিফুল হক চৌধুরীসহ প্রতিষ্ঠানটির ছয় কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। জেকেজির বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর ২৪ জুন করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজির অনুমতি বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পুলিশি তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে করোনা সনদ জালিয়াতিতে ডা. সাবরিনার নাম আসে। তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ও কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার। গত ১২ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং ওই দিনই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল থেকে ডা. সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাকে ১৩ জুলাই তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরীকে গত বুধবার দ্বিতীয় দফায় চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। আর সাবরিনাকে দ্বিতীয় দফায় দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় গত শুক্রবার। ডিবি কার্যালয়ে দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত