বাইতুল্লাহর হজ ও বিভিন্ন ধর্মের তীর্থযাত্রা

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২০, ০৭:১০ এএম

ইসলামের মৌলিকত্ব হলো তাওহিদ বা একত্ববাদ। আর এই একত্ববাদ শিক্ষার একমাত্র মাধ্যম রিসালাত। তাই বান্দা এবং আল্লাহর মধ্যে কোনো মাধ্যম ইসলাম যেমন সমর্থন করে না। তেমনি কোনো কিছুকে  আল্লাহতায়ালার আসনে বসিয়ে পূজা-অর্চনা করাও ইসলাম অনুমতি দেয় না। চিন্তা-মনোযোগ এবং প্রেম-অনুরাগ এক আল্লাহ ভিন্ন অন্য কোথাও কেন্দ্রীভূত করা ইসলাম মেনে নেয় না।

আবার আল্লাহর আশির্বাদপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা স্থানের ধারণা ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ, কোনো মাধ্যম ছাড়াই একজন বান্দা আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর যখন আমার বান্দা আমার সম্পর্কে আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, তখন (আপনি বলে দিন) আমি তো কাছেই আছি। আমি বান্দার ডাকে সাড়া দিই যখন আমাকে তারা ডাকে। তাদেরও উচিত আমার বিধান মেনে নেওয়া এবং আমার ওপর ইমান আনা। নিঃসন্দেহে তারা সৎ পথ প্রাপ্ত হবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত :১৮৬)

কিন্তু স্বভাব এমন কিছুর সন্ধান করে থাকে যাকে দেখে এবং যার সান্নিধ্যে এসে আখিরাতে আল্লাহর সঙ্গে মিলনের স্বাদ কিছুটা হলেও আস্বাদন করতে পারবে। তাই মহান আল্লাহ বান্দাদের জন্য কিছু স্থূল ও জড় বস্তু নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যা সেই মহান সত্তার পবিত্রতায় মহিমান্বিত। এগুলোর সঙ্গে এমন কিছু ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে যা মানুষকে তাওহিদের শিক্ষা দেয়। এগুলোকেই ‘শা-আইরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর নিদর্শন’ বলা হয়। যারা ‘আল্লাহর নিদর্শন’র প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তারা আল্লাহর প্রতিই সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবে তা তাদের হৃদয়ের পবিত্রতারই নিদর্শন।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩২)

আর বায়তুল আতিক বা বায়তুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত নিদর্শনগুলো শা-আইরুল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। ইমাম গাজালি (র.) ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থে লিখেছেন, যেহেতু পবিত্র কাবার সম্পর্ক হলো আল্লাহর মহান সত্তার সঙ্গে; তাই এটা স্বাভাবিক যে, প্রত্যেক মুসলমান হবে কাবাপ্রেমী। বায়তুল্লাহর জিয়ারতে ধন্য হবে। যদি এজন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো পুরস্কার ও উত্তম প্রতিদানের ঘোষণা না হতো তবুও।

ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (র.) তার অনবদ্য ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থে বলেন, মাঝেমধ্যে মানুষ তার রবের প্রেমে মাতোয়ারা ও উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। তখন সে তার আবেগ-উচ্ছ্বাস শান্ত ও তৃপ্ত করার অবলম্বন খোঁজে। অবশেষে সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, হজই হচ্ছে একমাত্র উপায় এবং বায়তুল্লাহর জিয়ারতই হচ্ছে সেই অবলম্বন।

পৃথিবীর প্রতিটি ধর্ম ও সম্প্রদায়ের কিছু পবিত্র বা তীর্থস্থান রয়েছে। বিশেষ ধর্মীয় উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ভক্ত অনুসারীরা সে সব পবিত্র স্থানের দর্শন লাভের উদ্দেশে তীর্থযাত্রায় বের হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রতিটি উম্মাহর জন্যই আমি কোরবানির ব্যবস্থা করেছিলাম, যেন তারা আল্লাহর নাম নিতে পারে সব প্রাণীর ওপর, আল্লাহ যা তাদের রিজিকরূপে দান করেছেন। তবে তোমাদের প্রভু কিন্তু এক-অভিন্ন। সুতরাং তারই সামনে তোমরা নত হও। আর যারা মস্তক অবনত করে, আপনি তাদের সুসংবাদ দান করুন।’ (সুরা হজ, আয়াত :৩৪)

মূলত পৃথিবীর কোনো জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায় তীর্থযাত্রার ইতিহাস থেকে বঞ্চিত নয়। সভ্যতার এ এক গৌরবময় ইতিহাস প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে ও যার ধারাবাহিকতা রয়েছে।

ইহুদি ধর্মের তীর্থযাত্রা

বর্তমান বিশ্বে ইহুদি জাতি জ্ঞান-বিজ্ঞান সভ্যতা-সংস্কৃতি, সম্পদ প্রাচুর্যে আগ্রগামী। সুদূর প্রাচীনকাল থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস তাদের তীর্যযাত্রা এবং উপাসনার শ্রেষ্ঠতধম স্থান। ইহুদি ধর্মের অন্যতম উৎস গ্রন্থ  Jewish Encyclopedia এ উল্লেখ করা হয়েছে

ক. . Harvest Festival L. Easter  ও গ.  Feast of Tabernacle এই তিনটি উৎসব উপলক্ষে বায়তুল মুকাদ্দাসে তীর্থযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো। শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক নারী ছাড়া সবার জন্য উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিল। প্রত্যেক তীর্থযাত্রীকেই কিছু একটা উৎসর্গ করার বিধান ছিল।

নির্দিষ্ট তারিখে তীর্থ উপসনা অনুষ্ঠিত হতো। সে দিবসগুলোর নাম ছিল, তীর্থ দিবস। এই দিবসগুলোতে নবী, বাদশাহ কিংবা দরবেশদের মাজার জিয়ারত করার প্রথা চালু হয়। সাধারণত শ্যামুয়েল নবী এবং ‘হায়কালে সুলায়মানি’ জিয়ারত করা হতো। এছাড়া প্রতিটি অঞ্চলেও ইহুদিদের তীর্থক্ষেত্র ছিল যেখানে তারা উৎসব পালন করত।

বুখতে নসর কর্তৃক Temple ধ্বংসের পরও তীর্থযাত্রার ধারা অব্যাহত ছিল। সালাহ উদ্দিন আইয়ুবির নেতৃত্বে ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পর ইহুদিদের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস, দামেস্ক এবং ইরাকের বিভিন্ন পবিত্রস্থানে যাত্রার দ্বার উন্মোচিত হয়। ক্রুসেডের সময় ইউরোপীয় ইহুদিরাও বায়তুল মুকাদ্দাস জিয়ারতের আগ্রহী হয়। ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে স্পেন থেকে ইহুদিরা বহিষ্কৃত হয়ে তুরস্ক এসে বসবাস শুরু করলে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

খ্রিস্টান ধর্মের তীর্যযাত্রা

খ্রিস্টধর্মের আধিপত্য পৃথিবীর দেশে দেশে বিস্তৃত।   Encyclopedia of Religion and Ethics  নামক বিশ্বকোষে খ্রিস্ট ধর্মের তীর্থ উপাসনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘প্রভু যিশুর পার্থিব জীবনের স্মৃতিবিজড়িত ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চল কিংবা রোমের ধর্ম নেতাদের আস্তানাগুলো কিংবা ঈশ্বরের প্রিয় পুরুষ ও শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানগুলো জিয়ারত করাই হলো তীর্যযাত্রা।’

খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের কাছে বায়তুল মুকাদ্দাসের পরই ছিল রোমের স্থান। সেন্ট পিটার ও সেন্ট পলের সমাধি এবং পোপবাদের বিস্তারের কারণে রোমান ক্যাথলিকদের কাছে রোম পবিত্র স্থান হিসেবে ধর্মীয় মর্যাদা লাভ করে। শহীদদের দেহাবশেষ থাকার কারণে Catacost খ্রিস্ট দর্শনার্থীদের কাছে ধর্মীয় মর্যাদা লাভ করে।

মোট কথা, ফিলিস্তিন ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত অঞ্চলে আরও অনেক গির্জা, আস্তানা এবং সমাধির কারণে খ্রিস্টান জাতির অসংখ্য তীর্থক্ষেত্র ও পবিত্র স্থান ছিল।

হিন্দু ধর্মের তীর্যযাত্রা

হিন্দুদের তীর্যক্ষেত্র ও পবিত্র স্থানের অধিকাংশই গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। যেমন এলাহাবাদের গঙ্গা-যমুনার সংযোগস্থল, উত্তর প্রদেশের বারানসি শহরের গঙ্গাস্নান, কাশির গঙ্গাস্নান ইত্যাদি। কাশীতে মৃত্যুবরণ করার জন্য অনেকেই শেষ বয়সে এখানে বসবাস শুরু করে। শ্রী কৃষ্ণের জন্মভূমি মথুরা, রামের কর্মস্থল অযোধ্যা এবং হিমালয়ের পাদদেশের হরিদ্বারও হিন্দুদের কাছে পবিত্র ও জনপ্রিয় তীর্থক্ষেত্র।

বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থযাত্রা

বৌদ্ধ ধর্মের তীর্থযাত্রা হলো গঙ্গা। এ ছাড়াও গোয়া তাদের পবিত্রতম স্থান। এসব স্থানে সারা বছর মেলা, পার্বণ ও উৎসব হয়ে থাকে।

বিভিন্ন ধর্মের ব্যাপারে ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ তার বিশ^বিখ্যাত গ্রন্থ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাতে বলেন, হজের মূল উপাদান পৃথিবীর সব জাতির মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে।

ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতি ও সুন্নত

রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা হজের স্থানগুলোতে অবস্থান করো। কেননা এটা তোমাদের পিতার উত্তরাধিকার।’ আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) মিল্লাতে হানিফার ইমাম। সুতরাং মিল্লাতের ইমাম থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত দশটি সুন্নত এবং হজের বিধি-বিধান যথাযথ হেফাজত করা আমাদের কর্তব্য।

জাহেলি যুগে কুরাইশরা গোত্রীয় অহংকারের কারণে অন্যান্য হাজির সঙ্গে আরাফাতে না গিয়ে মক্কায় অবস্থান করত। ইসলাম এই জাহেলি আচরণ ও গোত্রীয় অহংবোধকে প্রত্যাখ্যান করে নির্দেশ জারি করল, কুরাইশরা অন্যান্য হাজিদের সঙ্গে আরাফাত ময়দানে গমন করবে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তোমরা সেখানে গিয়ে প্রত্যাবর্তন করো, যেখানে গিয়ে অন্য লোকেরা প্রত্যাবর্তন করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত :১৯৯)

জাহেলি যুগে হজকে কেন্দ্র করে ‘উকাজ’, ‘জুল-মিজান্নাহ’ এবং ‘জুল-মাজাযের মতো মেলা বসত। সেখানে কবিরা একত্র হয়ে নিজ নিজ গোত্রের বীরত্ব ও প্রতিপক্ষ গোত্রের নামে কুৎসামূলক কবিতা আবৃত্তি করত। তাদের এই ঘৃণ্য কাজ বন্ধ করে আল্লাহ আমলে নিয়োজিত হওয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন, ‘যখন তোমরা হজের সব কাজ পূর্ণ করো, তখন আল্লাহকে স্মরণ করো স্বীয় পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার মতো কিংবা আরও উত্তমরূপে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত :২০)

জাহেলি যুগে হজের মধ্যে অশ্লীল কার্যকলাপ, খেল-তামাশা ছড়িয়ে পড়েছিল। মহান আল্লাহতায়ালা এ ধরনের কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেন। ইরশাদ করেন, ‘হজ অবস্থায় কোনো প্রকার অশ্লীল কথা, অশ্লীল আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত :১৯৭)

জাহেলিয়াত যুগের মুশরিকরা দেবদেবী ও উপাস্যের নামে পশু বলি দিত এবং গোশত দেবদেবীদের সামনে রেখে গায়ে রক্ত ছিটিয়ে দিত। এ ধরনের কার্যকলাপ অবৈধ আখ্যা দিয়ে মহান আল্লাহ ঘোষণা দেন, ‘আল্লাহর কাছে কুরবানিকৃত পশুর গোশত কিংবা রক্ত কিছুই পৌঁছাবে না। তবে তার কাছে তোমাদের তাকওয়া বা খোদাভীরুতা পৌঁছে।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)

সাফা-মারওয়ার পাদদেশে সায়ি করাকে অনেকে জাহেলিয়াত ভেবে ছেড়ে দিতো। তখন আল্লাহতায়ালা আয়াত অবতীর্ণ করেন,

‘নিঃসন্দেহে সাফা-মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। অতএব যে ব্যক্তি হজ কিংবা উমরা করবে, তার পক্ষে এটা পাপ নয় যে সে উভয়ের মধ্যে দৌড়াবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৮)

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত