‘কান নিয়েছে চিলে’ কথায় কথায় আমরা এ কথা বলি, উদাহরণ দেই। কিন্তু এর সারকথা কতজন মানি? আমাদের ‘গোল্ডফিস মেমোরি’ আবার সেই চিলের পেছনেই ছোটে অহেতুক। এই ছোটাছুটিতে উষ্ঠা খায়, পড়ে যায়, কিন্তু ঘুরে ফিরে একইকাজ করে বারবার। আমাদের সম্প্রচার মাধ্যমেরও হয়েছে একই দশা। কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সীমিত স্বাধীনতার মধ্যেই চেষ্টা করছে ক্ষমতা ও ব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার পাটাতনে ধরে রাখতে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই গা ভাসাচ্ছে গড্ডালিকা প্রবাহে। এরই এক উদাহরণ হতে পারে স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নিয়োগ নিয়ে সম্প্রচার মাধ্যমের ঘণ্টাখানেক ভুল তথ্যের পেছনে ছোটা। ভুল মানুষকে ডিজি বানিয়ে ব্রেকিং নিউজ দেওয়া।
‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি হচ্ছেন ডা. এনায়েত হোসেন’ একটি নিউজ চ্যানেল বৃহস্পতিবার বিকেলে এমন তথ্য প্রথমে তাদের স্ক্রলে ব্রেকিং হিসেবে দেয়। এর পরপরই সব চ্যানেলে তোলপাড়। কিছুক্ষণের মধ্যে অফিস থেকে ফোন, ‘ভাই ডিজি নিয়োগ তো হয়ে গেছে, আমরা কি দিবো?’ অফিসকে বললাম, আমি খবর নিচ্ছি, আরো যারা খোঁজ রাখছে, তাদেরও বলেন। আমি জানাচ্ছি, খোঁজ নিয়ে। এর মধ্যে দেখলাম এক মেসেঞ্জার গ্রুপে ডা, এনায়েত ডিজি হচ্ছেন এটা লিখা হয়েছে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই ফোন দিলাম মন্ত্রণালয়ের বিশ্বস্ত সোর্সকে। যিনি একই দিন দুপুরে অধিদপ্তরের নতুন হাসপাতাল পরিচালক হিসেবে ফরিদ হোসেন মিঞার নিয়োগের নিউজটা আমাকে দিয়েছিলেন। তার কারণে আমরা যমুনা টিভিতে সবার আগে সেই নিউজটা দিতে পেরেছিলাম। তাই সেই সোর্সের ওপর ভরসা রেখে ডিজি নিয়োগের তথ্য জানতে ফোন দিলাম।
বললাম, ‘নতুন ডিজি কী ডা. এনায়েত ?’ তিনি বললেন, ‘এনায়েত না, এটা কনফার্ম থাকেন। ৫/৭ মিনিট অপেক্ষা করেন নতুন ডিজির নাম জানাচ্ছি।’
আমি সাথে সাথে অফিসকে জানালাম, ‘ডা. এনায়েত ডিজি হচ্ছেন না, স্ক্রল দিয়ে থাকলে নামান। আর যদি অন্য সোর্সে মনে করেন ঠিক আছে, রাখতে পারেন।’ আমার অফিস আমার ওপর ভরসা রেখে ব্রেকিং স্ক্রল নামিয়ে দেয়। এদিকে সেই ৫/৭ মিনিটও আর যায় না। এর মাঝে সব টিভি চ্যানেল ড. এনায়েতকে ডিজি বানিয়ে স্ক্রল দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের যমুনা টিভির স্ক্রলে কিছুই যাচ্ছে না। আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি অনেকের এমন অনুভূতিতে মাথা ভনভন অবস্থা, চাপ। কী করব, সেই সোর্সের ফোনের অপেক্ষায় থাকলাম, ফোন আসে না। সেই সময়ে ৫/৭ মিনিটও কয়েক ঘণ্টার সমান। এই অপেক্ষার সময়টায় ল্যাপটপ কিনতে এলিফেন্ট রোডের মাল্টিপ্লান সেন্টারে ছিলাম। এর মাঝে একজনের ফোন। বললেন ‘ ড. এনায়েতই ডিজি, তার সাথে উচ্চ পর্যায়ের কয়েকজনের কথা হয়েছে’। আমি বললাম কনফার্ম থাকলে দেন। বাট আমার সোর্স বলছে এই তথ্য সঠিক না।
তার সাথে কথা শেষ করে মাল্টিপ্লান সেন্টার থেকে ল্যাপটপ না কিনেই বেরিয়ে পড়লাম। রিক্সা নিলাম, বাংলামোটর অফিসের পথে। রিক্সায় মাল্টি প্লান থেকে বাটা সিগন্যালে এগুতেই সেই বিশ্বস্ত সোর্সের ফোন। আমি দ্রুত ফোন ধরলাম। পাশ দিয়ে চলে যাওয়া বাসের হর্নে তার কথা একটু অস্পষ্ট। দ্বিতীয় দফা প্রশ্ন করে জানলাম, স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের নতুন ডিজি হিসেবে অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক। আমি সোর্সকে আরো কিছু প্রশ্ন করে নিশ্চিত হলাম। অফিসকে সাথে সাথে জানালাম। যমুনা টিভি অন্য সব টেলিভিশনের বিপরীতে গিয়ে ডা. আবুল বাসার খুরশীদ আলম ডিজি হচ্ছেন এই লাইনে স্ক্রলে নিউজ ব্রেক করল। অন্য সব টেলিভিশন একদিকে, যমুনা আরেক দিকে। কিন্ত তখনও স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন হয়নি। ডা. খুরশীদের নিউজটা দেওয়ার পর কয়েক জায়গা থেকে ফোন আসলে, জানতে চাইল তথ্য ঠিক আছে কি না? অন্য এক চ্যানেলের সিনিয়র একজন ফোনে বলল, ‘ড. এনায়েত স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের ডিজি, আর তার পূর্বের কর্মস্থল স্বাস্হ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজি হয়েছেন আবুল বাসার খুরশীদ আলম, আপনার তথ্যে ভুল আছে?’ অফিসে ঢুকেও একই তথ্য শুনতে পেলাম, আমরা ভুল দিচ্ছি না তো?
আবার সেই সোর্সকে ফোন দিলাম। বিষয়টা জানালাম তাকে। তিনি বললেন, ‘আপনি যেটা দিয়েছেন সেটাই ঠিক। অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগে তার স্থলে নিয়োগ পেয়েছেন খুরশীদ আলম। আর ডা. এনায়েত আগের জায়গায় আছেন।’
এরপরও টেনশন, যদি তথ্য ঠিক না হয় তাহলে আমার কারণে যমুনা টিভি ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। নিজেও সংকটে পড়ব। এরপরও সোর্স বিশ্বস্ত হওয়ায় আমার অবস্থানে অটল থাকলাম। এর মাঝে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজির নাম প্রকাশের সাথে সংশ্লিষ্ট একজনের সাথে কথা বলে একেবারে নিশ্চিত হলাম আমার তথ্যই ঠিক। মাথা থেকে ভার নেমে গেলো।
এরও বেশ কিছুক্ষণ পর মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন দেয়। এতেই আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজি হিসেবে নাম চলে আসে অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের। অন্য সব টেলিভিশন তখন যমুনার টিভির ঘণ্টাখানেক আগের দেওয়া তথ্যের সাথেই সুর মেলায়। আমাদের তথ্য প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সঠিক হয়। প্রজ্ঞাপন দেওয়ার কয়েক মিনিট আগে-পরে ডা. এনায়েতের বদলে ডা. খুরশীদ আলমকে ডিজি হিসেবে স্ক্রল দেয় সবাই।
দায়িত্বশীল, বিশ্বস্ত একজন সোর্স থাকায় একদিন হয়তো যমুনা ও আমি সঠিক তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলাম, আরেক দিন হয়ত পেছনে পড়ে যাব। কিন্তু ভুল তথ্যের পেছনে ছুটে বৃহস্পতিবার পুরো সম্প্রচার মাধ্যমই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই যে ব্রেকিং নিউজের প্রতিযোগিতা, হাঁটা সাংবাদিকতা, বারান্দা সাংবাদিকতা, এর ফলে আমাদের প্রতি দর্শকদের আস্থা কোথায় যাচ্ছে? নীতি নির্ধারকরা ভেবে দেখবেন কী? এর ফলে কী হচ্ছে? একটি টিভি একটি স্ক্রল দিলে, তখন আরেকটি টিভি চ্যানেলের রিপোটার অফিসের চাপে পড়ে তথ্য যাচাইয়ের সময়ও পায় না। আবার এ ধরণের একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চাইলেই কী সাথে সাথে পাওয়া যায়? যেই সোর্সকে ফোন দিবেন তাকে অন্য কেউ ফোন দিতে পারে, সে মিনিটের পর মিনিট ব্যস্ত থাকতে পারে। ফোন নাও ধরতে পারে। এতে দেরি হতে পারে। কিন্তু আপনি একটা স্ক্রলের জন্য পিছিয়ে যাবেন, এই মানসিকতায় যদি রিপোর্টারকে বার বার চাপ দেওয়া হয়, তখন সে কী করবে? এরকম চাপে পড়ে অনেকেই নিশ্চয়ই ‘অন্য টিভি আগে যেহেতু দিয়েছে আমরাও দেই’ টাইপের ফাঁদে পা দিবেন।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যের ডিজি নিয়োগের সংবাদটি স্ক্রলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ২/১টি বাদে সব টিভি চ্যানেল সেই ফাঁদেই পড়েছিলেন। এক্ষেত্রে একটু অপেক্ষা করলে কী হয়? আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন তো হবেই।
আমি অন্তত জানি, আমার সাবেক কর্মস্থল এটিএন নিউজ ডিজি নিয়োগের প্রজ্ঞাপনের পরই নিউজটি স্ক্রলে দিয়েছিল। আর দায়িত্বশীল একজনের তথ্য মোতাবেক সংশোধন করে প্রজ্ঞাপনের আগেই সঠিক তথ্যই দিয়েছে আমার বর্তমান কর্মস্থল যমুনা টিভি। কিন্তু স্রোতে গা ভাসানো সাংবাদিকতার যে ট্রেন্ডে আমরা আছি, তাতে আরেক দিন আমি বা আমরাই আবার সংশোধিত না হয়ে ভুল করতে পারি।
তাই নীতি নির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ রিপোর্টারকে সময় দিন। নিশ্চিত তথ্যের জন্য দেরি হলে অপেক্ষা করুন। যদি দায়িত্বশীল সোর্স নিশ্চিত না করে তাহলে প্রজ্ঞাপনের জন্য মাথাটা ঠান্ডা রাখেন। না হলে আমাদের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জবাবদিহিতার সংসদে প্রশ্ন উঠতেই থাকবে, এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছেও। অনেকেই বলেছে, ডিজি নিয়োগের নিউজ নিয়ে এত প্রতিযোগিতা কেন সম্প্রচার মাধ্যমের? আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য প্রকাশের আগে এই নিউজটা না দিলে কী দর্শক আপনাকে বা আপনার গণমাধ্যমকে গালি দিতে? এতে কী দেশের কোনো ক্ষতি হতো? আপনারা কী পিছিয়ে যেতেন?
এর উত্তর কী? করোনার সংকট সময়ে স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের নতুন ডিজি কে হচ্ছেন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এজন্য ভুল বা নিয়োগের সাথে সরাসরি যুক্ত কারো কাছ থেকে তথ্য না জেনে সেকেন্ডারি সোর্স থেকে নিউজ ব্রেক করা একেবারে ঠিক হয়নি। একটা স্ক্রল নিশ্চিত হয়ে একটু পরে দিলেও নিশ্চয়ই জনপ্রিয়তায় বেশি হেরফের হতো না। কারণ দর্শকের বিশ্বাস ও আস্থা আপনার কনটেন্ট বা আধেয়র ওপর, স্ক্রলে না। আপনি যেই সময়ে আছেন, সেই সময়ে ক্ষমতা ও ব্যবস্থাকে কতটা প্রশ্ন করতে পারছেন, কতটা জবাবদিহিতায় রাখতে পারছেন, কতটা সঠিক তথ্য দিচ্ছেন- এর ওপরই নির্ভর করে আস্থা।
তবে গণমাধ্যমের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা-নির্ভরতা ধ্বংসে সব সময় রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন পক্ষ কাজ করে। এই বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। যদি স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয় আগে থেকেই ডিজি নিয়োগসহ সংকটময় সময়ে উদ্যোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্রিফ করার ঘোষণা দিতে, তাহলে কিন্তু বেশিরভাগ সম্প্রচার মাধ্যম এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো না। সরকার তথ্য চেপে রাখলে, আনুষ্ঠানিকভাবে না জানালে এমন গোলযোগ হওয়ার পথ তৈরি হয়। আর সরকার ও ক্ষমতাবানরা চায়ও এমন।গণমাধ্যম যদি আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটে পড়ে এতে তাদেরই লাভ। ক্ষমতাবানদের এই রাজনীতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন মার্কিন বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস হারম্যান।
তাদের গবেষণামূলক ‘সম্মতি উৎপাদন বা ম্যানুফ্যকচারিং কনসেন্ট’ বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে সরকার, বড় বড় বিনিয়োগকারী ও প্রভাবশালীরা গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে। কীভাবে একটি মিথ্যা তথ্য তারা বাজারে ছড়িয়ে দেয়, তা প্রচারে প্রলুব্ধ করে, চাপ দেয়। এভাবে গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হলে, একে তারা পুঁজি করে। আস্থাহীন গণমাধ্যম তখন সরকার বা ক্ষমতাবানদের যৌক্তিক সমালোচনা, ভুল-ত্রুটি, দুর্নীতি-অনিয়ম তুলে ধরলে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে ভোগে। গণমাধ্যম এই রাজনীতি বুঝলেও কেন বারবার সেই আগুনেই ঝাঁপ দেয়, এই সময়ে সেই সুলুক সন্ধানই জরুরী?
আলমগীর স্বপন: বিশেষ প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন।
