রিসারজেন্টের ওয়েবিনারে বক্তারা

চীনে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা কাজে লাগানোর আহ্বান

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২০, ০৭:৫৪ এএম

চীন সম্প্রতি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল শনিবার রিসারজেন্ট বাংলাদেশ আয়োজিত ‘কভিড-১৯ সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য : বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং উত্তরণ’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এ আহ্বান জানানো হয়। ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি শামস মাহমুদ।

বিজনেস ইনিশিয়েটিভ ফর লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে আমরা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কভিড পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত চাহিদা কমে যাবে। এতে আমাদের রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা আসতে পারে। চীন সম্প্রতি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগতে হবে। এ সময় দেশের ওয়্যারহাউজ এবং লজিস্টিক খাতকে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে ঘোষণারও প্রস্তাব করেন তিনি। আবুল কাসেম খান আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। এতে ব্যর্থতা এলে কভিডপরবর্তী সময়ের বাণিজ্য সুবিধা অর্জনে আমরা ব্যর্থ হব।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বিশ্বের বেশ কিছু বড় কোম্পানি চীন থেকে কারখানা ও ক্রয়াদেশ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এটি আমাদের জন্য বড় সুযোগ। এ ধরনের সুযোগ পেতে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, বন্দরে মাল খালাসে ধীরগতির কারণে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনায় ব্যয় বাড়ছে। ফলে আমরা প্রতিনিয়তই বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারাচ্ছি। সম্প্রতি চীনের দেওয়া বাংলাদেশি ৮ হাজার ২৫৬ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা গ্রহণে আরও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন বলে ঢাকা চেম্বার সভাপতি মতপ্রকাশ করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দৃঢ় করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে আরও গুরুত্ব প্রদান এবং এফটিএ, পিটিএ ও টিকফার মতো চুক্তির দ্রুততম বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে আড়াই কোটি ডলার বাড়তি আয় করা সম্ভব।

এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর অর্থবছরের প্রথমার্ধে রপ্তানি খাতের নেতিবাচক প্রবণতার জন্য ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ বলে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, দেশে আন্তর্জাতিক বিল পরিশোধ পদ্ধতি বেশ পুরনো। এটি যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। এছাড়া তিনি ‘ফ্রি ট্রেড ওয়্যারহাউজ জোন’ চালুর প্রস্তাব করেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হলে আমাদের পণ্যে ১২ শতাংশ শুল্কারোপ করা হবে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। এটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। তিনি জানান, গত অর্থবছর বাংলাদেশ ৪ হাজার কোটি ডলারের রপ্তানি করে। ভিয়েতনাম সে সময় রপ্তানি করে ২৬ হাজার ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে মূল্যায়ন ২০২১ সালে হওয়ার কথা। এ প্রক্রিয়া সরকার ৩-৪ বছর পিছিয়ে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করতে পারে। অথবা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর আরও কয়েক বছর বর্তমান সুবিধা বহাল রাখার আহ্বান জানান। তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ‘কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক ট্রিটি’ স্বাক্ষরের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।

এনার্জিপ্যাক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিতরণ সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এ খাতে দক্ষ জনবলের খুবই অভাব। এজন্য তিনি শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়ন জরুরি বলে মতপ্রকাশ করেন।

পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, আমাদের রপ্তানিতে বহুমুখীকরণ করতে হবে। তরুণদের জন্য মানসম্মত চাকরি নিশ্চিত করতে হবে, যা টেকসই অর্থনীতির অন্যতম পূর্বশর্ত। তিনি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিমালাগুলোর মধ্যে সমন্ব^য় বাড়ানো প্রয়োজন বলে মতপ্রকাশ করেন। বলেন, তৈরি পোশাক খাতের ন্যায় অন্যান্য খাতেও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তিনি ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও এর ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোক্তাদের নীতি-সহায়তা  দেওয়ার আহ্বান জানান।

উত্তরা মোটরসের হেড অব বিজনেস প্ল্যানিং নাইমুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে অটোমোবাইল খাতের বিক্রি এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। এ খাতে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব বলে মতপ্রকাশ করে তিনি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন চার্জ কমানো এবং সহজ শুল্ক কাঠামো প্রবর্তনের আহ্বান জানান।  

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি নিহাদ কবীর এ সময় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিদ্যমান সমস্যা দ্রুত সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং ব্যবসায়িক নেতাদের নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব করেন।

পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত রপ্তানিনির্ভর। এটা আমাদের ধরে রাখতে হবে। তিনি বলেন, কভিডপরবর্তী সময়ে নীতিমালা গ্রহণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর রপ্তানিতে নতুন নতুন পণ্য যোগ হলেও সঠিক প্রণোদনা এবং নীতি-সহায়তার অভাবে অনেক পণ্যই টিকে থাকতে পারে না। তিনি তৈরি পোশাকের প্রদত্ত নীতি-সহায়তা ও প্রণোদনার সুবিধা অন্যান্য খাতে প্রদানের আহ্বান জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত