হজের খুতবায় করোনামুক্তি ও বিশ্বশান্তি কামনা

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২০, ০৬:৪৩ এএম

সৌদি আরবে মক্কা নগরী থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত মসজিদে নামিরা থেকে দেওয়া হজের খুতবায় শায়খ আবদুল্লাহ বিন সোলায়মান আল মানিয়া করোনা মহামারী থেকে মুক্তি ও বিশ্বশান্তি কামনা করেছেন। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই, ৯ জিলহজ) স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে বারোটায় সালাম দিয়ে হজের খুতবা শুরু করেন তিনি। খুতবার শুরুতে তিনি আল্লাহতায়ালার প্রশংসা ও হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করেন। খুতবায় তিনি বৈশ্বিক মহামারী করোনা থেকে মুক্তি, গোনাহ মাফ, আল্লাহতায়ালার রহমত কামনাসহ সমসাময়িক প্রসঙ্গ নিয়ে নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি মানুষের অধিকার- বিশেষ করে নারীর অধিকার ও উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। সেই সঙ্গে ওয়াদাপালন, মাতাপিতার সেবা, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ, মানবসেবা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় নাগরিকদের সচেতন হওয়ার ওপর জোর দেন।

শায়েখ মানিয়া খুতবায় কোরআনে কারিমের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে মানুষকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসারী হওয়ার আহ্বান জানান। ইবাদত-বন্দেগির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করেন। আরাফাতের ময়দানে করণীয়সহ হজের পরবর্তী বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। নামাজ, পবিত্রতা অর্জন, রোগীর সেবা, মহামারী উপদ্রুত এলাকায় প্রবেশ না করা এবং ওইসব এলাকা থেকে অন্যত্র না যাওয়ার বিষয়ে হাদিসের নির্দেশনা উল্লেখ করে বলেন- আশা করি,  খুব দ্রুত বৈশ্বিক এই মহামারী কেটে যাবে। আবার আগের মতো হজ ও ওমরাহর যাত্রীদের আগমনে মুখরিত হবে পবিত্র এই ভূমি।

হজের অন্যতম ফরজ হলো ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। আরাফাতের ময়দানে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই রীতি অনুযায়ী প্রতি বছর ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে হজের খুতবা দেওয়া হয়। এ বছর প্রথমবারের মতো হজের আরবি খুতবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে সম্প্রচার করা হয়। সৌদি আরবের সরকারি দুটি সম্প্রচার মাধ্যম হজের খুতবা ১০টি ভাষায় অনুবাদ করে প্রচার করে। বাংলা ছাড়া অন্য নয়টি ভাষা হলো- ইংরেজি, মালয়, উর্দু, ফার্সি, ফ্রেঞ্চ, মান্দারিন, তুর্কি, রুশ ও হাবশি। ২০১৯ সালের হজে ৫ ভাষায় হজের খুতবার অনুবাদ প্রচারিত হয়েছিল।

বাংলা ভাষায় হজের খুতবার অনুবাদ সম্প্রচারের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা অন্য উচ্চতায় পৌঁছাল। বিশ্বদরবারে বাংলা ঠাঁই করে নিল ভিন্নভাবে। এমনিতে মক্কা-মদিনায় বিশেষ করে হজের আচার-আচরণ পালনের স্থানগুলোতে আরবি, উর্দু, ফারসি ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড আরও আগে থেকেই ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলায় হজের নির্দেশিকা সংবলিত পুস্তক, লিফলেট ও সিডি বিতরণ করা হয় বেশ কয়েক বছর ধরেই। এমনকি, সৌদি আরবের প্রশাসন বাংলা ভাষাভাষী প্রচুর সংখ্যক অনুবাদক নিয়োগ দিয়েছেন মক্কার দর্শনীয় স্থানগুলোতে।

পবিত্র কাবা, মহানবী (সা.)-এর রওজা মোবারকের সান্নিধ্যে মুসলমানদের শক্তি, মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের চাবিকাঠি নিহিতÑ তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। হজে একদিকে রয়েছে আল্লাহর কাছে মোনাজাত, কাকুতি-মিনতি ও তাকে স্মরণের মাধ্যমে আত্মিক সম্পর্ক লাভের সুযোগ, অন্যদিকে রয়েছে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর অপার সম্ভাবনা। সবগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। হজকে স্বাভাবিক ভ্রমণ মনে করা যাবে না।

হজ যাবতীয় অজ্ঞতার মোকাবিলায় ইসলামের গৌরবময় বিষয়। এই হজ ইসলামের আহ্বান তুলে ধরে এবং তুলে ধরে ইসলামি সমাজের প্রাণময়তা ও গতিশীলতার প্রতীককে। হজ মানুষকে শেখায়, ইসলামে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বৈষম্য এবং পাপ-পঙ্কিলতা ও দুর্নীতির উপস্থিতি নেই। হজের লক্ষ্ আল্লাহর স্মরণ, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং সর্বজনীন স্বার্থ ও কল্যাণকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা। আরাফাতের ময়দান থেকে এ সংকল্প করতে হবে। তাহলে মুসলমানের অন্তর প্রশান্তিতে ভরে উঠবে এবং সে এমন একটি সমাজ বিনির্মাণে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও প্রচেষ্টা চালাতে উৎসাহী হবে।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত