মঙ্গলগ্রহে একটি অনুসন্ধানী রকেট পাঠানোর দুই সপ্তাহের মধ্যে শনিবার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম চুল্লিটি চালুর করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
আমিরাত বলছে, দক্ষিণ কোরীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির চারটি চুল্লিই চালু হওয়ার পর এখান থেকে ৫.৬ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে যা দিয়ে দেশের ২৫ শতাংশ চাহিদা মিটবে।
বিবিসি বলছে, ২০১২ সালে ২০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প হাতে নেওয়ার পর থেকেই এর যৌক্তিকতা, ঝুঁকি এবং উদ্দেশ্য নিয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে তো বটেই, আন্তর্জাতিক মহলেও সন্দেহ-বিতর্ক চলছে।
বিশেষ করে কাতার এবং ইরানের গভীর সন্দেহ যে, আমিরাতের মূল লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি।
কারণ উপসাগরীয় এই দেশটি দিনকে দিন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতে যুক্ত হচ্ছে যার প্রমাণ লিবিয়া এবং ইয়েমেন।
গত বছর কাতার জাতিসংঘ আণবিক সংস্থার (আইএইএ) কাছে লিখিত এক আপত্তিপত্রে বারাকা পারমাণবিক স্থাপনাকে ‘আঞ্চলিক শান্তি এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি’ বলে বর্ণনা করে।
কাতার বলেছে, যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা হলে তেজস্ক্রিয় উপাদান ১৩ ঘণ্টার মধ্যে তাদের রাজধানী দোহায় চলে আসবে।
শনিবার বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর এখনো কাতার বা ইরানের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া শোনা যায়নি। কিন্তু তারা যে ক্ষোভে ফুঁসছে তা নিয়ে কারোরই সন্দেহ নেই।
বারাকা পারমাণবিক প্রকল্পের ওপর শুরু থেকেই গভীর নজর রাখছেন পারমাণবিক শক্তি বিষয়ে বিশ্বের শীর্ষ একজন বিশেষজ্ঞ পল ডর্ফম্যান।
মার্চে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে তিনি লিখেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবেই। কারণ, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ করে দেয়।‘
ড. ডর্ফম্যান বলেন, ‘আমিরাতের এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল একটি এলাকাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে। পরিবেশের জন্য যেমন ঝুঁকি, তেমনি এই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা নতুন করে উস্কে দিতে পারে এটি।’
আমিরাত অবশ্য জোর দিয়ে বলে যাচ্ছে, উদ্বেগ উৎকণ্ঠার কোনো কারণ নেই, তারা শুধুই তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে।
দেশটি বলছে, আইএইএ‘র সঙ্গে বিস্তর বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এখানে তারা নিজেরা ইউরেনিয়াম শোধন করবে না বলে মুচলেকা দিয়েছে। শোধন করা জ্বালানি আসবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
আইএইএ-তে আমিরাতের প্রতিনিধি হামাদ আল কারবি জাপানের দৈনিক নিকেইকে শনিবার বলেন, ‘ইউরেনিয়াম শোধনের কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমিরাতের কোনো সামরিক অভিলাষও নেই।’
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে মেরুকরণের রাজনীতি দিন দিন যেভাবে প্রবল হচ্ছে, যার একদিকে সৌদি আরব ও আমিরাত আর অন্যদিকে ইরান ও কাতার, সেজন্য আমিরাতের এই প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করতে পারছে না অনেকেই।
বাতাস (উইন্ড এনার্জি) এবং সূর্যকে কাজে লাগিয়ে (সোলার এনার্জি) লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অসামান্য সুযোগ আছে আমিরাতের। ফলে এত পয়সা বিনিয়োগ করে, চরম ঝুঁকিপূর্ণ এক ভূ-রাজনৈতিক আবহের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে কেন দেশটি যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞও দ্বিধায়।
নিউইয়র্ক টাইমস ড. ডর্ফম্যানকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ‘আমিরাতের এই আগ্রহের পেছনে অন্য কোনো আকাঙ্ক্ষা হয়তো লুকিয়ে রয়েছে- পারমাণবিক অস্ত্র।’
শুধু অস্ত্র তৈরির গোপন আকাঙ্ক্ষার সম্ভাবনা নিয়েই কথা হচ্ছে না, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির ওপর হামলার ঝুঁকি এবং তেমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কেন্দ্রটিতে কতটা জোরালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে তা নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে।
আল-জাজিরার একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক স্থাপনায় এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১৩টি হামলা হয়েছে যে সংখ্যা বিশ্বের অন্য যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
আবুধাবির রুয়াইস শহর থেকে ৫৩ কিলোমিটার দূরে বারাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের সময়ে ২০১৭ সালে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা স্থাপনাটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছিল।
‘কোর ক্রাচার’ নামে পরিচিত যে প্রযুক্তি বড় কোনো দুর্ঘটনায় মূল চুল্লিটিকে রক্ষা করে, তা আদৌ বারাকা কেন্দ্রে রয়েছে কিনা এবং সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলার বিরুদ্ধে নিরাপত্তা (জেনারেশন থ্রি ডিফেন্স ইনডেপ্থ) কতটা বারাকায় করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অবশ্য আইএইএ আশ্বস্ত করেছে, বারাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তারা পুরোপুরি ওয়াকিবহাল।
তবে সম্ভাব্য কোনো পারমাণবিক দুর্ঘটনায় প্রতিবেশী দেশগুলো দূষণের শিকার হলে তার দায় কে নেবে, এ নিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে কোনো চুক্তি নেই। এ নিয়ে কাতার উদ্বিগ্ন।
তবে শুধু আমিরাতই নয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে সৌদি আরব, মিশর এবং এমনকি জর্ডানও।
সৌদি আরব ইতিমধ্যেই কয়েকটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে, আর মিশর চারটি স্থাপনা তৈরির জন্য রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে ফেলেছে।
জাপানের দৈনিক নিকেই তাদের এক বিশ্লেষণমূলক রিপোর্টে বলছে, যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি বিস্তারে সায় দিচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি শিল্প এখন মধ্যপ্রাচ্যকে একটি লোভনীয় বাজার হিসেবে বিবেচনা করছে। এখানকার প্রধান ক্রেতা হতে চলেছে ইরানের চিরশত্রু সৌদি আরব।
