ময়মনসিংহ সদর উপজেলার সিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রাম। দুদিন আগেও গ্রামটি ছিল অনেকটাই অচেনা। শান্ত সুনিবিড় গ্রামটিতে হঠাৎই ছন্দপতন ঘটেছে। পাশের নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার রাজালিকান্দা হাওর কেড়ে নিয়েছে এ গ্রামেরই ৩৮ বছর বয়সী হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমানসহ ১২ মানুষের প্রাণ। এই গ্রামের পাশাপাশি সদর উপজেলার চরগোবিন্দপুরে একজন, চরখরিচায় দুইজন এবং গৌরীপুর উপজেলার ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামের আরও দুজনের জীবন নিয়েছে ওই সর্বনাশা হাওর। এর সবকটি গ্রামই এখন স্বজনহারাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে।
তবে একই পরিবারের ৮ জনসহ ট্রলারডুবিতে নিহতদের ১২ জনই সদর উপজেলার সিরতা ইউনিয়নের কোনপাড়া গ্রামের হওয়ায় এ গ্রামটিতে এখন কেবলই কান্নার রোল। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন নিহতদের স্বজনরা। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদের কোনাপাড়ার মানুষ সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা যেন কেবলই বৃথা প্রচেষ্টা। একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু গ্রামবাসীও মেনে নিতে পারছেন না। হাউমাউ করে কেঁদে উঠছেন তারাও। শোকাবহ এমন পরিস্থিতিতেই গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সোয়া ৬টার দিকে কোনাপাড়া ঈদগাহ মাঠে ওই গ্রামের ১২ জনের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। পরে সকাল ৭টার মধ্যে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহর পাশেই একসঙ্গে পাশাপাশি ৯ জনের কবর দেওয়া হয়।
জানা যায়, বরাবরের মতো এবারও ঈদের পরপরই আনন্দ ভ্রমণে যায় ময়মনসিংহ সদরের ‘মাদ্রাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহ’সহ স্থানীয় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সদরের চরভবানীপুর এলাকার সেই রীতি বহাল রাখা হয় করোনা মহামারীর সময়েও।
মাদ্রাসা প্রধান মাওলানা মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে কোনাপাড়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষকদের মাধ্যমে নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার ‘মিনি কক্সবাজার’খ্যাত উচিতপুর হাওরের উদ্দেশে গত বুধবার সকালে বের হয় ৪৮ জনের একটি দল। তাদের বেশিরভাগই ছিল শিশু-কিশোর। মদন উপজেলার সেই উচিতপুর পৌঁছে সেখানকার নৌঘাট ছেড়ে যাওয়ার কিছু সময় পরেই হাওরে ডুবে যায় তাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি। খবর পেয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। একে একে উদ্ধার হয় ১৭টি মরদেহ। ঈদ আনন্দ ভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয় বিষাদে।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন ‘মাদ্রাসায়ে মারকাজুস সুন্নাহ’র মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমান (৪৫), তার দুই ছেলে হাফেজ মাহবুবুর রহমান আসিফ (১৫) ও মাহমুদুর রহমান (১২), ভাগ্নে রেজাউল করিম (১৫), ভাতিজা জোবায়ের (২০) ও জোনায়েদ (১৭), ভাতিজি লুবনা (১৩) ও জুলফা (৭), চরখরিচা গ্রামের কৃষক ইসা মিয়া (৪০) ও তার ছেলে শামীম (১০), কোনাপাড়া গ্রামের মাদ্রাসাশিক্ষক আজহারুল ইসলাম (৩৮), হামিদুল (৩৫), সাইফুল ইসলাম রতন (৩০) ও জহিরুল ইসলাম (৩৫), চরগোবিন্দপুরের তালেব মেম্বারের ছেলে শহিদুল (৪০) এবং গৌরীপুর উপজেলার ধোপাজাঙ্গালিয়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে শফিকুর রহমান (৪০) ও তার ছেলে সামাআন (১০)। এছাড়া নিখোঁজ রাকিবুল ইসলামের লাশ গতকাল ভোরে পাওয়া গেছে।
৬ থেকে ৭ মিনিট পানিতে ডুবে ছিলেন মাওলানা জাকির হোসেন : সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে যাওয়া হাফেজ মাওলানা মাহফুজুর রহমানের ভাতিজা ঢাকার ফরাসগঞ্জ কুদরত উল্লাহ জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. জাকির হোসেন কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, তার দুই ভাই মুজাহিদ ও হাফেজ জুবায়ের এবং চাচাতো দুবোনও মারা গেছে।
দুর্ঘটনার মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তীব্র ঢেউয়ের মধ্যে সাঁতার কেটে শক্তি দিয়ে কিছুক্ষণ পানির উপরে থাকার চেষ্টা করি। এরপর শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লে আস্তে আস্তে শরীর পানির নিচে যেতে থাকে। উপায়ান্তর না দেখে দুটি হাত পানির উপরে উঁচু করে তুলে রাখি। ট্রলার যাত্রীদের কান্নাকাটি ও চিৎকারের শব্দ শুনে পরে আশপাশের লোকজন ট্রলারের যাত্রীদের উদ্ধার করতে দ্রুত সময়ের মধ্যেই চলে আসে। ৬-৭ মিনিট পানির নিচে থাকার পর একজন এসে আমার হাত ধরে উদ্ধারকারী নৌকায় তুলে নেয়। তখন আমার শরীর প্রায় অচেতন। একটু পর চাচাতো বোন লুবনা আক্তার (১০) ও জুলফা আক্তারকে (৭) তুলে আনা হয়। ট্রলারে তোলার সময় ওরা জীবিত থাকলেও মুহূর্তের মধ্যেই ওরাও প্রাণ হারায়।’
মাহফুজুর রহমানের ভগ্নিপতি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘সকালে পরিবারের সকলে আনন্দ ভ্রমণে গিয়েছিল। কে জানত এটাই যে তাদের শেষ বিদায়।’ এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি ।
নিহত রেজাউলের মা রেহেনা খাতুন ছেলের কথা বলতে বলতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ছেলে ছোট থাকতেই তার বাবা মারা গেছেন। মামার বাড়িতে থেকেই রেজাউল পড়াশোনা করত।’
স্থানীয় কোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোকছেদ মিয়া বলেন, ‘কী আর বলব। সবাই একসঙ্গে হাওরে গিয়েছিল আনন্দ করতে। কোথা থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারছি না। এখন সবাই শুধু কাঁদছে। একসঙ্গে এত মরদেহ এর আগে দেখেনি কোনাপাড়া গ্রামের মানুষ।’
যেভাবে ঈদ আনন্দ বিষাদে পরিণত : মদন উপজেলার মিনি কক্সবাজার হিসেবে খ্যাত উচিতপুরে নৌকা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মাদ্রাসাশিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ মোট ৪৮ জন একটি বাস ৯ হাজার টাকায় ভাড়া করে বুধবার সকাল সাড়ে ৬টায় যাত্রা করেন। পথে তেলিগাতিতে যাত্রা বিরতি ও সেখানে অনেকে নাশতা করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মদন উপজেলায় পৌঁছেন তারা। সেখানে দলের সদস্য গৌরীপুরের শফিকুল ইসলাম আগেই গিয়ে একটি ট্রলার ভাড়া করেন। ওই ট্রলারে চড়ে সবাই রওনা দেন হাওর ভ্রমণে। ইঞ্জিনচালিত ট্রলারটি যাত্রা শুরু করার ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই তীব্র বাতাস ও ঢেউয়ের কবলে পড়ে। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে ট্রলারের ওপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও বড় বড় কয়েকটি ঢেউয়ের পানি এসে পড়ে ট্রলারের ভেতরে। এতে ট্রলারটি পানিতে ভরে যায়। ট্রলারের একটি কোনা তখন ডুবতে থাকে। এ সময় ৪৮ জন ট্রলারযাত্রীর উচ্চস্বরে কান্নাকাটি ও আর্তচিৎকারে উচিতপুরের রাজালিকান্দা এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রলারটি ডুবে যায়। এতে ৩০ যাত্রী জীবন নিয়ে উদ্ধারকারী নৌকায় উঠতে পারলেও ১৮ জনের মৃত্যুতে মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠে রাজালিকান্দা এলাকা।
শোক ও আর্থিক সহায়তা : নেত্রকোনায় ট্রলারডুবিতে নিহতদের প্রতি গভীর শোকপ্রকাশ করে ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার মো. কামরুল হাসান এনডিসি জানান, ট্রলারডুবিতে নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, মদন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ৭ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। এরপর কোনাপাড়ায় ময়মনসিংহ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফ হোসাইন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বুধবার রাতেই নিহতের পরিবারের স্বজনদের পাশে গিয়ে সমবেদনা জানান।
তারা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং জাতীয় সংসদ সদস্য ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের পক্ষ থেকে আরও ৫ হাজার টাকা এবং একটি সংস্থার পক্ষ থেকে আরও ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। মারা যাওয়া প্রতি পরিবারকে সর্বমোট ৩৭ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়।
