করোনা সুরক্ষা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ডা. আবুল কালাম আজাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত টানা ৫ ঘণ্টা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বাধীন একটি অনুসন্ধান দল। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে কঠোর পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, সৎ, অহংকারমুক্ত, সরল, সজ্জন, মেধাবী ও সফল কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদত্যাগী ডিজি আবুল কালাম আজাদ। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ইউনুস আলী এবং গবেষণা কর্মকর্তা ডা. মো. দিদারুল ইসলামকেও দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলওয়ার বখত সাংবাদিকদের বলেন, ‘করোনা মহামারীর কালে স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদ, উপপরিচালক মো. ইউনুস আলী ও গবেষণা কর্মকর্তা ডা. মো. দিদারুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। অনুসন্ধান কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে কী তথ্য পেয়েছেন সেটা অনুসন্ধানের স্বার্থে প্রকাশ করা যাবে না।’
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আবুল কালাম আজাদ দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুদক আমাকে করোনা দুর্যোগের সময় সিএমএসডির (কেন্দ্রীয় ঔষধাগার) কেনাকাটায় অনিয়মের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসতে অনুরোধ করেছে। আমি তাদের অনুরোধে হাজির হয়েছি। এ কেনাকাটায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে আমার কিছু করার থাকে না। তারা তাদের মতো করে কেনাকাটা করেছে। দুদকের কর্মকর্তারা আমার কাছে যেসব প্রশ্ন জানতে চেয়েছেন আমি তার সব জবাব দিয়েছি।’
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আবুল কালাম আজাদ আগে থেকে লিখে আনা বক্তব্য সাংবাদিকদের পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ‘আমি একজন কঠোর পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে সারাজীবন কাজ করেছি। আমি একজন অহংকারমুক্ত সরল এবং সজ্জন ব্যক্তি। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আমার পর্যাপ্ত জ্ঞান অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা আছে। করোনার মতো মহাদুর্যোগে যাতে লাখ লাখ মানুষের জীবনহানি না ঘটে সেজন্য আমার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, বিবেকবোধ ও সদিচ্ছা থেকে নিজের জীবনকে তুচ্ছ বলে মনে করে কাজ করেছি। আমি নিজে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০ দিন চিকিৎসাধীন থেকে বলা যায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। সুস্থ হয়ে পরদিনই কাজে যোগ দিয়েছি।’
আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘করোনাকালীন বিভিন্ন স্বাস্থ্যসামগ্রী কেনার বিষয়ে অভিযোগ ওঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে আমি কী জানি তার জন্য দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা আজ (গতকাল) আমাকে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আমি যা জানি তা তাদের বিস্তারিত বলেছি। তদন্তাধীন বিষয় সম্পর্কে এই মুহূর্তে আমার পক্ষে এর বেশি কিছু আপনাদের বলা সম্ভব নয়।’
নানা সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এ ডিজি আরও বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন যে আমি ২০১৬ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলাম। আমি লক্ষ্য করছিলাম যে, আমাকে নিয়ে অপপ্রচারের অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। পদ আঁকড়ে রাখা আমার কাছে সম্মানের বিষয় নয়। তাই বিবেকতাড়িত হয়ে গত ২১ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করি। সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, কেউ অপরাধ করলে তার কঠোর শাস্তি হোক এটা আমিও চাই। এ বিষয়ে তদন্তে আমি প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করে যাব।’
দুদক বলছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরস্পর যোগসাজশে ‘অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে’ কভিড-১৯-এর চিকিৎসার জন্য ‘নিম্নমানের’ মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কিনে বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ এসেছে কমিশনের হাতে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধানে গত ১৫ জুন দুদক কর্মকর্তা জয়নুল আবেদীন শিবলীকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে কমিশন। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) এক উপপরিচালকসহ তিন কর্মকর্তাকে গত ২০ জুলাই দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর গত ৬ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদকে তলব করে চিঠি পাঠায় দুদক।
এছাড়া করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ ও চিকিৎসার বিষয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চুক্তির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে তাকে আজ বৃহস্পতিবার আবারও কমিশনের কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে। করোনা মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একের পর এক কেলেঙ্কারিতে সমালোচনার মুখে গত ২১ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন ডা. আজাদ।
