বিধি উপেক্ষা করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কয়েকটি প্রকল্পে জুনিয়র কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অধীনে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাজ করানোয় অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এছাড়া অধিদপ্তরে উপপরিচালকসহ কিছু পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় মাঠপর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম গত শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি। এলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। আমার অধীন মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরে কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।’
মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া নথি ও সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে মহিষ প্রজনন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম গত মে মাসে মারা যান। নিয়ম অনুযায়ী নতুন পিডি নিয়োগ অথবা সমপর্যায়ের কাউকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়ার কথা। কিন্তু মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রকল্পে একজন মনিটরিং অফিসারকে (ভেটিরিনারি সার্জন) ভারপ্রাপ্ত পিডি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সে সময় জানান, অর্থবছর শেষ হওয়ায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জুনের শেষে অধিদপ্তরের ডিজি ডা. আবদুল জব্বার শিকদার নতুন পিডি নিয়োগে তিন কর্মকর্তার নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠান। কিন্তু এখনো পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়নি। জুনিয়র ওই কর্মকর্তা সম্প্রতি প্রায় ১২ কোটি টাকার মালামাল ক্রয় ও নির্মাণকাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছেন। বেশকিছু কর্মপরিকল্পনাও অনুমোদন দিয়েছেন। গত জুনেও তিনি প্রায় ৪০ কোটি টাকার কার্যাদেশ এবং ৮ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন সিলেট, লালমনিরহাট ও বরিশাল ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলএসটি) স্থাপন প্রকল্পের জন্য ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) এবং পঞ্চম গ্রেডের এক কর্মকর্তাকে (জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা) পিডি নিয়োগের সুপারিশ করে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একনেকের সুপারিশসহ সরকারি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ষষ্ঠ গ্রেডের এক কর্মকর্তাকে (উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা) পিডি নিয়োগ দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘অধিদপ্তরে অধস্তন ওই কর্মকর্তার জ্যেষ্ঠ অন্তত ৭৮ জন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবং পঞ্চম গ্রেডভুক্ত শতাধিক জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের থেকে নিয়োগ না দিয়ে এমন একজনকে বেছে নেওয়া হয়, যার বিরুদ্ধে অন্য প্রকল্পের ক্রয় কর্মকর্তা হিসেবে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অধিদপ্তর থেকে ঝালকাঠিতে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।’
গত মে মাসে হাওর ও সিটমহাল প্রাণিসম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত দুটি প্রকল্প একনেকে পাস হয়। দুই মাসের বেশি হলেও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অধিদপ্তরের ‘সমঝোতা’ না হওয়ায় প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হয়নি। যদিও হাওরাঞ্চলে সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পে ডিপিপি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে পঞ্চম গ্রেডের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একজন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে পিডি করা হয়।
অধিদপ্তরের পিপিআর রোগ নির্মূল ও ক্ষুরা রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের পিডি ডা. মো. এমদাদুল হক গত ১৪ জুলাই করোনায় মারা যান। গত ৪ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে মন্ত্রণালয় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. হাতেম আলীকে (পঞ্চম গ্রেড) ওই প্রকল্পে সংযুক্ত করে। একইদিন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. অমর জ্যোতি চাকমাকে (ষষ্ঠ গ্রেড) এ প্রকল্পের আয়ন-ব্যয়ন ক্ষমতাসহ প্রকল্প পরিচালকের সাময়িক দায়িত্ব দেয়। এ আদেশের ফলে একজন উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তার অধীনে কাজ করতে হচ্ছে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের, যা অধিদপ্তরের চেইন অব কমান্ডে বিঘœ ঘটাচ্ছে বলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন। তারা জানান, অধিদপ্তরের উপপরিচালকের (কৃত্রিম প্রজনন) পদ তিন মাস শূন্য। মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের পছন্দসই কর্মকর্তা না মেলায় মহাপরিচালকের প্রস্তাব থাকার পরও কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রশাসন, ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক ও ঢাকা জেলার জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পদও শূন্য। এছাড়া গত ২৭ এপ্রিল জেলাপর্যায়ের পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরও ৩২ কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট পদে পদায়ন না করে তাদের রেখে দেওয়া হয়। পরে গত ৪ আগস্ট এসব পদে পদায়ন করা হয়। কিন্তু দেরির কারণে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়নে বিঘœ ঘটে। সাধারণত এসব পদে কোন কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হবে, তা অধিদপ্তর থেকে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের প্রস্তাব মন্ত্রণালয় আমলে নেয়নি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) পদ গ্রেড-১ভুক্ত হলেও কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষমতা নেই। এমনকি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বদলির নির্দেশনাও আসে মন্ত্রণালয় থেকে। অধিদপ্তরের সব ধরনের প্রশাসনিক ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবের ইচ্ছাধীন বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার বলেন, ‘মহিষ উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পের উপযুক্ত কর্মকর্তাদের পিডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রস্তাবনা আমলে নেওয়া হচ্ছে না। পিডি নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে, এখানে অধিদপ্তরের কিছু করার নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘অধিদপ্তরে প্রথম শ্রেণির সব পদে নিয়োগ এবং বদলির নির্দেশনা আসে মন্ত্রণালয় থেকে। এ বিষয়ে আমার হাতে কোনো ক্ষমতা নেই।’
অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের একটি সংগঠনের সভাপতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিদপ্তরে কাজের স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। ডিজির হাতে ন্যূনতম উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাকে বদলির ক্ষমতাও নেই। ফলে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। সুযোগ সন্ধানীরা এটিকে কাজে লাগিয়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সুবিধাজনক স্থানে বদলি হন, পিডিসহ বড় বড় পদ বাগিয়ে নেন। ফলে তারা অধিদপ্তরের আদেশ-নিষেধ তোয়াক্কা করেন না।’
