কুড়িগ্রামের সাবেক ডিসি সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আবার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় এবং সুলতানা পারভীনের কারণ দর্শানো নোটিসের জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ আগস্ট এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল রবিবার কমিটির সদস্যদের কাছে কমিটি গঠনের আদেশ পাঠানো হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আলী কদরের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. আহসান কবীর ও আমেনা বেগম। কমিটির সদস্যদের কাছে অভিযোগনামা, অভিযোগ বিবরণী ও অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পাঠিয়ে অবিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে একই অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভাগীয় মামলায় আনা অভিযোগ তদন্ত করার জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির প্রধান হচ্ছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আমেনা বেগম। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পি কে এম এনামুল করীম ও মোহাম্মদ কামাল হোসেন। গত ১২ আগস্ট গঠিত কমিটিকে নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতিপরায়ণতার অভিযোগে সাত কর্মদিবসের মধ্যে শুরু করার কথা বলা হয়েছে। তদন্ত শেষ করে সুস্পষ্ট মতামতসহ দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মো. আলী কদর গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিভাগীয় মামলার কাগজপত্র পেয়েছি। খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে।’
ডিসি সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ পুনরায় তদন্ত করা হচ্ছে কেন জানতে চাইলে আলী কদর বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যখন পুরো বিষয় পর্যালোচনা করে মনে করে বিভাগীয় মামলাটি চালিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্ব রয়েছে। তখন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় মামলা দায়ের, অভিযোগ গঠনের পর পুনরায় তদন্তে দিতে পারেন।’
তদন্ত কমিটি গঠনের আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটিকে তদন্ত কাজ শুরু করার জন্য কোনো সময় বেঁধে দেওয়া হয়নি। কিন্তু আরডিসি নাজিম উদ্দিনের তদন্ত কমিটিকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কাজ শুরু করতে বলা হয়েছে। একইভাবে তদন্ত কমিটিকে দুই মাস সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সুলতানা পারভীনের তদন্ত কমিটিকে সময় বেঁধে না দিয়ে অবিলম্বে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
গত ১৪ মার্চ কুড়িগ্রামে মধ্যরাতে বাংলাট্রিব্রিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামের বাড়িতে ঢুকে তাকে ধরে নিয়ে জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট এক বছরের কারাদন্ড দেয়। তার বাড়িতে আধা বোতল মদ এবং গাঁজা পাওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এভাবে মধ্যরাতে বাড়ি থেকে একজন সাংবাদিককে ধরে এনে সাজা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার হলে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে। রংপুরের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিভাগীয় মামলা করা হয়। জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন, আরডিসি নাজিম উদ্দিন ও ২ সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এস এম রাহাতুল ইসলামকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।
গত ২৫ জুন কারণ দর্শানো নোটিসের জবাব দিয়েছেন সুলতানা পারভীন। এর আগে আরডিসি নাজিম উদ্দিন, সহকারী কমিশনার ও মোবাইল কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এনডিসি এস এম রাহাতুল ইসলাম বিভাগীয় মামলায় আনা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন।
কারণ দর্শানো নোটিসের জবাবে সুলতানা পারভীন জানিয়েছেন তিনি মধ্যরাতে সাংবাদিক আটক ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। মোবাইল ফোনে আসা ‘মিসড’ কল নম্বরে পরের দিন সকালে ফোন ব্যাক করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিবের কাছ থেকে প্রথম ঘটনা শুনেছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বিভাগীয় মামলায় সুলতানা পারভীনের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর জবাবে তিনি বলেছেন, পত্রিকাগুলো কীসের ভিত্তিতে এ অভিযোগ করেছে তা তার বোধগম্য না। তিনি জানিয়েছেন তিনি কোনো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেননি। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য তিনি কোনো মৌখিক বা লিখিত নির্দেশনা দেননি। এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মধ্যরাতে সাংবাদিক আটকের সময় সেখানে উপস্থিত না থাকার দাবি করেছেন কুড়িগ্রামের সাবেক আরডিসি নাজিম উদ্দিন। তিনি কেবল কাস্টডি ওয়ারেন্টের সাজাপ্রাপ্ত আসামি সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে জেলখানায় গ্রহণের পদ্ধতিগত আনুষ্ঠানিকতা করার দাবি করেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কারণ দর্শানো নোটিসের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। গত ৩ জুন তিনি কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব দেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকার দাবি করলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রিন্টু বিকাশ চাকমার কারণ দর্শানো নোটিসের জবাবে নাজিম উদ্দিনের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতির কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশ হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলার সাবেক আরডিসি নাজিম উদ্দিনের সম্পদের হিসাব চেয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। চাকরিতে যোগদানের সময় সম্পদের যে হিসাব বিবরণী তিনি জমা দিয়েছিলেন তার পরিপূরক সম্পদ বিবরণী জমা দিতে বলা হয়েছে। গত ১৯ মে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
