চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার রাসেল আহমেদ (৩২), ৪ লাখ টাকা খরচে গত ফেব্রুয়ারিতে কম্বোডিয়া যান। এজন্য জমি বিক্রি ছাড়াও স্থানীয় মহাজন থেকে চড়া সুদে ঋণ করেন তিনি। স্ত্রী-সন্তান ও বিধবা মা রাসেলের উপার্জনে সংসারে স্বাচ্ছন্দ্য ফেরার আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চলতি মাসে তার জন্য ২০ হাজার টাকা পাঠাতে হয়েছে।
একইভাবে ভালো বেতনে চাকরির আশায় ব্যবসা ছেড়ে কম্বোডিয়া যান বগুড়ার আহমেদ রনী। তিনি ধারদেনা করে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেন স্থানীয় একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক আব্দুল আজিজকে। রনী কম্বোডিয়া গেলেও স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। ছয় মাসেও কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। উল্টো এখন মাসে মাসে বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে চলছেন তিনি।
গত রবিবার কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে টেলিফোনে রাসেল-রনীর মতো একাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক এই প্রতিবেদককে জানান, স্থানীয় দালাল ও ঢাকার একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সির মিথ্যা আশ্বাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া এসে ভয়াবহ বিপাকে পড়েছেন অন্তত ৪২ বাংলাদেশি। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১৫ জন গ্রেপ্তার আতঙ্কে ঘরবন্দি আছেন। অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) না থাকায় কাজও খুঁজে নিতে পারছেন না অনেকে। ফলে চরম আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।
এসব শ্রমিকের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় মালয়েশিয়ান একটি কোম্পানিতে ৫৫০ ডলার (প্রায় ৪৪ হাজার টাকা) বেতনে চাকরি, থাকা-খাওয়া, দেশে আসা-যাওয়ার খরচ বহনসহ ৩ বছরের ভিসার আশ্বাস দেওয়া হয় তাদের। স্থানীয় দালালরা এজন্য ৪২ জনের কাছ থেকে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত নেন। পরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের সাব্বির টাওয়ারে রিক্রুটিং এজেন্সি শেরপুর ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে কম্বোডিয়া পাঠানো হয়। তবে নমপেন নেমেই স্বপ্নভঙ্গ হয় শ্রমিকদের। প্রতিশ্রুত কোম্পানি আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। পরে শেরপুর ইন্টারন্যাশনালের মালিক সোলায়মান মিয়া কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে চীনা একটি কোম্পানিতে কাজের ব্যবস্থা করেন। এজন্য তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয় ৩০০ ডলার (প্রায় ২৪ হাজার টাকা)। দুই মাস কাজের পর করোনা মহামারীর কারণে বেশিরভাগ শ্রমিককে গিয়ে বিপাকে ৪২ প্রবাসী ছাঁটাই করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর শ্রমিকরা মহাবিপাকে পড়েন। এদের মধ্যে ৬ মাস মেয়াদের ভিসাধারীরা বেশি সংকটে রয়েছেন। ওয়ার্ক পারমিট শেষ হওয়ায় তারা অন্য প্রতিষ্ঠানেও কাজ খুঁজে নিতে পারছেন না।
আতাউর রহমান নামে এক শ্রমিক বলেন, ‘আমাদের খাওনের পয়সা নাই। ওয়ার্ক পারমিট ভিসা করমু কী দিয়া? তাইলে আমরা জমি-জিরাত বিক্রি কইরা চাইর লাখ পাঁচ লাখ ট্যাকা দিয়া আইলাম ক্যান?’ আহমেদ রনী বলেন, ‘ফোন দিলেও সোলায়মান সাব ধরেন না। আমরা যার যার লোকাল দালালরে ফোন দেই, তারা দ্যাশে গিয়্যা মামলা কইর্যা দিতে কয়! কত কষ্টে এইখানে আছি, সেইটা সোলায়মান সাবরা বুঝব না!’
এ বিষয়ে গতকাল সোমবার নমপেন থেকে টেলিফোনে সিদ্দিক অ্যান্ড সোথা এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আগে কখনো এভাবে লোক নিয়োগ দিইনি। সোলায়মানের অনুরোধ রাখতে গিয়ে খুব ঝামেলায় পড়েছি। এদের কারও ওয়ার্ক পারমিট নেই। শ্রমিকরা বারবার অনুরোধ করছেন। সোলায়মান অনেকদিন ধরে ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এত টাকা খরচ করে এখানে এসেছে, তাদের বিপদে ফেলা ঠিক হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারিভাবে কম্বোডিয়ায় শ্রমিক আনার অনুমতি নেই। তবে শ্রমিক সংকটের কারণে চীন ও মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারত থেকে কিছু শ্রমিক নিয়োগ দেয়। করোনা সংকটে এসব বিদেশি কোম্পানি বন্ধ রয়েছে। এতে দেশটিতে অবস্থানরত প্রায় ১২-১৫ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন। দেশ থেকে টাকা এনে এখন তাদের চলতে হচ্ছে।’
শেরপুর ইন্টারন্যাশনালের মালিক সোলায়মান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৪২ জনের মধ্যে ১১ জনের ছয় মাসের ভিসা, বাকিদের এক বছর। ওয়ার্ক পারমিট না থাকলেও সবাই কাজ করছে। করোনার কারণে আমি যেতে পারিনি। এজন্য ভিসা লাগানো হয়নি। ওয়ার্ক পারমিটের চেষ্টা চলছে। তাদের নিজেদের ওয়ার্ক পারমিট করে নিতে বলেছি। কিন্তু তারা মানছে না।’
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরির বন্দোবস্ত করা রিক্রুটিং এজেন্সির দায়িত্ব। এসব শ্রমিক কম্বোডিয়া যাওয়ার পরই করোনা মহামারীতে সব বন্ধ হয়ে যায়। তাদের ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসার জন্য সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।’
