নরসিংদীর মাধবদীতে দাম্পত্য কলহ নিরসনের জন্য আয়োজিত সালিশ বৈঠকে তালাকের রায় শুনে পারভীন আক্তার (৪০) নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন। গত সোমবার রাত ১২টার দিকে স্থানীয় সাগরদী গ্রাম থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত পারভীন আক্তার পাইকারচর ইউনিয়নের সাগরদী গ্রামের সাইদ মিয়ার মেয়ে ও একই গ্রামের জাহাঙ্গীর মিয়ার স্ত্রী।
পারভীনের বাবা সাইদ মিয়া বলছেন, থানা ছাত্রলীগ সভাপতি মাসুদ রানাসহ সালিশ বৈঠকের বিচারকরা এক পক্ষের হয়ে কাজ করেছেন। তাদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের কারণেই তার মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন প্রেমের পর পারভীন আক্তারের বিয়ে হয় একই গ্রামের ওসমান মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। এটি স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দ্বিতীয় বিয়ে। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই তাদের মধ্যে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। এর জের ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়। পরে সেটা সালিশ পর্যন্ত গড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার উভয়পক্ষকে নিয়ে মাধবদী থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা এবং পাইকাচর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বার জাহাঙ্গীর আলমসহ এলাকার মাতব্বররা সালিশে বসেন। তবে সালিশে উপস্থিত হননি গৃহবধূ পারভীন। তার বাবা সাইদ মিয়া উপস্থিত ছিলেন। সালিশে পারভীনের স্বামীর পক্ষের কথা শুনে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত দেয় বিচারকরা। বিয়ের কাবিননামা এক লাখ পঞ্চাশ টাকা হলেও সালিশে মাত্র বিশ হাজার টাকা মেয়ের বাবাকে দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রস্তাব দেন বিচারকরা। কিন্তু এই রায় মানেননি পারভীনের বাবা। পরে এই খবর শুনে হতাশ হয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন পারভীন। খবর পেয়ে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নিহত পারভীনের ভাই কাউছার মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সালিশে মাতব্বরদের চাপের কারণেই জামাই আমার বোনকে তালাকে রাজি হয়েছে। সালিশে আমার বোনকে না রেখেই তারা নিজের ইচ্ছামতো রায় দিয়েছে। যেখানে কাবিন আছে দেড় লাখ টাকার, আর তারা রায় দিয়েছে ২০ হাজার টাকা। এই কারণেই অপমানে ও ক্ষোভে সে (পারভীন) বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে।’
নিহতের বাবা সাইদ মিয়া বলেন, ‘২০ হাজার টাকা দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত দেয় বিচারকরা। টাকা দিয়ে আমি কী করব? বিচারকদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের কারণেই আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাইকাচর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বার জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাহাঙ্গীর দুটি বউকে নিয়ে ঠিকমতো সংসার চালাতে পারে না। এজন্য সে সালিশে দ্বিতীয় স্ত্রী পারভীনকে তালাক দেবে বলে জানায়। কিন্তু পারভীন সেখানে উপস্থিত না থাকায় কোনো রায় হয়নি। আর জরিমানার ব্যাপারে একেকজন একেক কথা বললেও কোনো টাকা নির্ধারণ করা হয়নি। এছাড়া সালিশে তালাক দেওয়ার জন্য কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।’
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে মাধবদী থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি সৈয়দুজ্জামান বলেন, ‘একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে এমন খবরের ভিত্তিতে পুলিশ গিয়ে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে পাঠায়। পরে জানতে পেরেছি, এর আগে স্থানীয়রা উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সালিশ বৈঠক করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
