ক্রিকেটার-পুলিশের নাম ভাঙিয়ে উজ্জ্বলের প্রতারণা

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৫৩ এএম

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) এক সময় বল কুড়াতেন আশরাফুল ওমর উজ্জ্বল (৩২)। এরই সুবাদে জাতীয় দলের অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে তার ছবি রয়েছে। এসব ছবি দেখিয়ে পরে পুলিশের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন এবং তাদের সঙ্গেও ছবি তুলে সেগুলো ফেইসবুকে দেন তিনি।

এসব গুরুত্বপূর্ণ  ব্যক্তির সঙ্গে নিজের ছবি সাধারণ মানুষকে দেখিয়ে প্রতারণার জাল পাতেন উজ্জ্বল। অনেকের সন্তানকে বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। শেয়ারে ব্যবসা এমনকি শোরুমে গিয়ে গাড়ি কেনার নামে প্রাইভেটকার নিয়েও সটকে পড়েন তিনি। অবশেষে গত ৩১ আগস্ট রাজধানীর ডেমরা থেকে প্রতারক উজ্জ্বলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে তার সহযোগীরা গা ঢাকা দিয়েছেন।

পুলিশের ভাষ্য, উজ্জ্বল বিকেএসপির সাবেক শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সাবেক ক্রিকেটার পরিচয় দিতেন। জাতীয় দলের চার ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে প্রতারণা করতেন। তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের বদলির তদবির করার জন্যও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার এসব প্রতারণার সহযোগী জনি নামের এক যুবক। মূলত জনিই তাকে এই পথে নিয়ে আসেন। অথচ যেসব ক্রিকেটারের নাম ভাঙিয়ে উজ্জ্বল প্রতারণা করেছেন, তাদের কারও সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাকে চেনেনও না।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডেমরা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) রাকিবুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উজ্জ্বল বিভিন্ন ক্রিকেটারের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে সাধারণ মানুষ এমনকি পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। তিনি বেশিরভাগ প্রতারণা করেছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল, মেহরাব হোসেন অপি, তুষার ইমরান ও মুশফিকুর রহিমের নাম ভাঙিয়ে। অথচ এসব ক্রিকেটারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার কথা বলে অনেক অভিভাবক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন উজ্জ্বল। তার সহযোগী হিসেবে জনি নামে একজনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

উজ্জ্বলের প্রতারণার শিকার একাধিক ব্যক্তি জানান, উজ্জ্বল তার মুঠোফোনে অ্যাপসের মাধ্যমে অন্যের কণ্ঠ হুবহু নকল করতেন। হুটহাট টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফোন ধরিয়ে দিতেন। ফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে কখনো জনপ্রিয় ক্রিকেটার; কখনো পুলিশের বড় কর্তা কথা বলতেন। ফলে সহজেই আস্থা অর্জন করতে পারতেন। নামি ক্রিকেটারের ভক্তদেরই টার্গেট করতেন উজ্জ্বল। বিপদের কথা বলে টাকা ধার নিয়েও অনেককে ফেরত দেননি তিনি।

ভুক্তভোগী মো. ফাৎহুন কবির ভূঁঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বারিধারা প্রগতি সরণির জাপান মোটরস লিমিটেডে এসে উজ্জ্বল নিজেকে ক্রিকেটার মেহেরাব হোসেন অপির ছোট ভাই এবং পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার আত্মীয় বলে জানান। এরপর টয়োটা এক্সিও ২০১৪ মডেলের একটি প্রাইভেটকার কেনার জন্য ট্রায়ালের কথা বলে ভেগে যান। তিনি আমার মতো অনেকের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, উজ্জ্বলের বাড়ি ডেমরার কোনাপাড়ার মোমেনবাগে। বাবা ব্যবসায়ী হাফিজ আহম্মেদ তাকে বিকেএসপিতে ভর্তি করেছিলেন। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে বের হয়ে আসেন। তখন থেকেই বখে যান এবং প্রতারণা শুরু করেন। গত ২৬ জুন রাজধানীর বারিধারায় একটি শোরুম থেকে প্রতারণার মাধ্যমে প্রাইভেটকার নিয়ে সটকে পড়ার পর পুলিশ সেটি উদ্ধার করে। এর আগে গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর কদমতলি এলাকায় লিয়াকত ফরাজী নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ব্যবসার কথা বলে দেড় লাখ টাকা নিয়ে আর ফেরত দেননি। সম্প্রতি উজ্জল কদমতলি থানার এক এএসআই থেকে ৫ লাখ টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন। গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসছে।

উজ্জ্বলের একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডেমরা থানার এসআই মো. সেলিম মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকেএসপিতে বল কুড়াতেন উজ্জ্বল। এরই সুবাদে ক্রিকেটারদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ছবি তুলে রাখতেন। পরে সেসব ছবি প্রতারণার কাজে ব্যবহার করেছেন। তবে প্রতারণার অর্থ জুয়া খেলে শেষ করেছেন। এমনকি ডেমরায় নিজেদের বাড়িও বিক্রি করে ফতুর হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ডেমরা ও ভাটারা থানায় আরও দুটি প্রতারণা মামলা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত