বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আনতে মরিয়া সরকার। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের শুল্ক-অশুল্ক বাধায় এ বিনিয়োগ আসছে না। এসব সমস্যা সমাধান না হলে জাপানি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের জাপানি দূতাবাস। জাপানি বিনিয়োগকারীরা বলছেন, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ পেতে হলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন করতে হবে। এর মধ্যে ট্যাক্সেস বা কর, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ব্যবসার প্রফিট বা মুনাফার অংশ নিজ দেশে প্রত্যাবাসন পদ্ধতির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তারা এটাও জানান, বিদ্যমান জাপানি বিনিয়োগকারীরা এখনো এসব সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এসব সমস্যা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব সমস্যা নিরসনে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ যাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। অগ্রগতি নিয়ে আগামী অক্টোবরে আবারও বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ-জাপানের সরকারি-বেসরকারি যৌথ অর্থনৈতিক সংলাপে (পিপিইডি) এসব সমস্যার কথা জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে জুম প্ল্যাটফর্মে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সভায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে কর ও বৈদেশিক এক্সচেঞ্জ ইস্যুতে বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুপারিশমালা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। বাংলাদেশ পক্ষে এ বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহসভাপতি উদ্যোগ নেবেন। যত দ্রুত সম্ভব ওয়ার্কিং গ্রুপের কো-চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি অনলাইন সভা আহ্বান করা হবে।
এ ছাড়া আগামী অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পর্যালোচনার জন্য পরবর্তী সভার ব্যবস্থা করা হবে। যেখানে পিপিইডি সিদ্ধান্তের অগ্রগতি তুলে ধরা হবে। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভাটি নির্ধারণের আগে বিভিন্ন কার্যনির্বাহী, বিশেষ করে জাপানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নেওয়া হবে।
সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, গত বছর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজির সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ গঠিত প্ল্যাটফর্মটি কাজ করছিল। সভায় বর্তমান মুখ্য সমন্বয়ক জুয়েনা আজিজ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ১৬ আগস্ট পিপিইডির চতুর্থ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২৪ আগস্টের সভায় আগের বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়। প্রারম্ভিক বক্তৃতায় জুয়েনা আজিজ বলেন, করোনার মধ্যেও এ ধরনের সভা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। ধারাবাহিক সভার মাধ্যমে দুই দেশের বিনিয়োগ সমস্যা নিরসনে একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব হবে; বিশেষ করে পিপিইডি দুই দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সেতুবন্ধ তৈরিতে সহায়ক হবে।
এ সময় তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপ হয়। দুই প্রধানমন্ত্রী করোনা-পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকা- স্বাভাবিক করা ও দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
সভায় জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করব যেন জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন করে। এর মধ্যে ট্যাক্সেস বা কর সমস্যা নিরসন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ব্যবসার লাভের টাকা নিজ দেশে প্রত্যাবাসন পদ্ধতির সহজ করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, এখন যেসব জাপানি বিনিয়োগকারী এ দেশে বিনিয়োগ করেছেন, তারাও এসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী-শেখ হাসিনার ফোনালাপকে স্বাগত জানিয়ে ইতো নাওকি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন যে বাংলাদেশ জাপানিদের জন্য একটি ইকোনমিক জোন তৈরি করেছে। সেখানে জাপানি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। এ সময় জাপানি প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতার কথা জানিয়েছেন বলে জানান রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, জাপানি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জাপানি কোম্পানির জন্য বাংলাদেশে এখনো কিছু সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে; বিশেষ করে ট্যাক্সেশন ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের বিষয়টি অন্যতম বলে উল্লেখ করেন। এ জন্য এসব সমস্যা নিরসনে অবশ্যই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, এই সংলাপ তখনই ফলপ্রসূ হবে, যখন দুপক্ষের বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া যেসব আলোচনা হলো তার পরিপ্রেক্ষিতে কী কী অগ্রগতি হয়েছে, তা পরের বৈঠকে উপস্থাপন করা যেতে পারে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১ সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরা হয়।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্রেড পলিসির সহকারী পরিচালক অনদেরা ওসামু বলেন, ৭ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়েছে। কভিড-১৯ দুই দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষতি সাধন করেছে। সারা বিশে^ই এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ বাণিজ্য পরিবেশ, স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে জাপানি বিনিয়োগকারীরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, জাপানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সমস্যার কথা বলা হয়েছে। আগামী মাসে (অক্টোবর) অনুষ্ঠিতব্য সভায় এসব সমস্যা নিরসনে অগ্রগতি তুলে ধরা হবে।
সভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানি বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসি) সভাপতি, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) আলোচনায় অংশ নেয়।
