কুকুর অপসারণের প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:০৮ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা থেকে সিটি করপোরেশনের লোকজন ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে তুলে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে শিক্ষার্থীরা জানান, সোমবার টিএসসি এলাকা থেকে ১০-১২টি কুকুর ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভেটেরিনারি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রমনা পার্ক থেকে কুকুর অপসারণ করা হয়েছে। গত রবিবার থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কুকুর অপসারণ অভিযান শুরু করেছে।

অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ক্লাব অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাবরিনা সাব্বির মঙ্গলবার একটি গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা পাঁচ দিন কুকুরগুলোকে খাবার দিই। গতকাল আমাদের ফিডিং ছিল না। আজকে আমরা এসে দেখি, টিএসসিতে কোনো কুকুর নাই। লোকজনের কাছে জানতে পারি, গতকাল (সোমবার) সিটি করপোরেশনের লোকজন গাড়ি নিয়ে এসে ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা বলে আমাদের কুকুরগুলো তুলে নিয়ে গেছে।

কুকুরগুলোর সন্ধানে নগর ভবনে গিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে গিয়ে জানতে পারি, তাদের রমনা পার্ক থেকে কুকুর ধরার কথা ছিল, কিন্তু ভুলে আমাদের কুকুরগুলোকে তারা ধরে নিয়ে মাতুয়াইলে ফেলে দিয়ে আসছে।

বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাবে ঢাকা শহরের আনুমানিক ৬০ হাজারের মতো বেওয়ারিশ কুকুর থাকতে পারে। তবে এর কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

শফিকুল ইসলাম বলেন, তহবিলের অভাবে গত কয়েক বছর ধরে বন্ধ্যাত্বকরণ কর্মসূচি বন্ধ রয়েছে। যার কারণে ঢাকা শহরের কুকুরের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

যদিও এই সংখ্যার সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তাদের হিসাবে ঢাকার দুই সিটিতে মোট ৩৭ হাজার কুকুর রয়েছে।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বেওয়ারিশ কুকুরের কারণে নানা ধরনের সমস্যায় পড়ার কথা জানিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, তহবিলের অভাবে বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি বন্ধ থাকায় গত কয়েক বছরে শহরে কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে। বেওয়ারিশ কুকুরের সমস্যার কারণে এর আগে ৩০ হাজার কুকুর সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

তবে প্রাণীকল্যাণ বিষয়ক সংগঠনগুলোর বিরোধিতার পর সেটি আর কার্যকর হয়নি।

এ নিয়ে ডিএসসিসির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, নাগরিক সমস্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে কুকুরগুলো সরিয়ে নেয়ার কথা ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু সেটি আর এখন নেই।

তিনি বলেন, কুকুরের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। মেয়র সাহেব এ বিষয়ে অবগত আছেন। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

কুকুর সরিয়ে নেয়ার খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়ে ওঠে পশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।

কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ প্রকল্পে ত্রুটি দেখা দেয়ায় এদের বংশ বৃদ্ধি হওয়ার কারণে ঢাকার রাস্তায় হঠাৎ করেই কুকুরের সংখ্যা বেড়ে গেছে।

তবে রাজধানীর মিরপুর এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান বিবিসিকে বলেন, তার এলাকায় একাধিক কুকুর থাকলে সেখানকার বাসিন্দারা ভয় না পেয়ে উল্টো মাটির পাত্রে করে কুকুরের খাবার দেয়।

এদিকে কুকুরগুলোকে স্থানান্তরের বিরোধিতা করেছেন প্রাণী কল্যাণ নিয়ে কাজ করা আন্দোলনকারীরা। তারা বলছেন, স্থানান্তর করলে আসলে সমস্যা কমবে না বরং আরও বাড়বে।

এনিমেল কেয়ার ট্রাস্ট বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন পরিচালনা করেন আফজাল খান। তিনি বলেন, এতো সংখ্যক কুকুরকে একসাথে কোন একটি অঞ্চলে ছেড়ে দেয়া হলে সেখানে অবশ্যই খাদ্য সংকট দেখা দেবে।

তিনি বলেন, মফস্বল বা গ্রাম্য এলাকায় যদি কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয় তাহলে অবশ্যই খাবারের সংকট হবে। কারণ শহরের মানুষদের মতো সেখানকার বাসিন্দারা কুকুরের প্রতি এতোটা সংবেদনশীল নয়। খাবারের সংকট হওয়ার কারণে তখন কুকুরগুলো মানুষকে কামড়ানোর চেষ্টা করবে। এছাড়া কুকুর নিধন এবং স্থানান্তর বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ। এর পরিবর্তে কুকুরগুলোকে বন্ধ্যা করা এবং জলাতঙ্ক টিকা দেয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

নগর-পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বিশ্বের কোন সভ্য দেশেই রাস্তা-ঘাটে যেখানে সেখানে কুকুর ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় না। এটা শিশু, নারী, বয়স্ক এমনকি প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের জন্য অসুবিধার হতে পারে। তারা ভয় পেতে পারে।

তবে কুকুরের বাঁচার অধিকার আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন তা হতে হবে, স্বাস্থ্যসম্মত এবং প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী।

বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, পশু সম্পদ বিভাগ ছাড়াও প্রাণী কল্যাণে কাজ করা সংগঠনগুলোর সাথে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রাণী কল্যাণ সংগঠনগুলোরও এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে সহায়তা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত