দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে চীন

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:২১ এএম

লাদাখের প্যাঙ্গন লেক ঘিরে সামরিক উত্তেজনা চলছে ভারত-চীন সীমান্তে। বাংলাদেশ বরাবরই ভারতের বিশ্বস্ত বন্ধু কিন্তু সীমান্ত হত্যা, পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ, তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া ইত্যাদি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এই দূরত্বের ফায়দা নিতে বাংলাদেশের দিকে অর্থনৈতিক বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বাড়তে থাকা ঘনিষ্ঠতা নিয়ে গতকাল শনিবার একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের শহর সিলেটে চীন একটি নতুন বিমানবন্দর টার্মিনাল নির্মাণ করতে যাচ্ছে। গত এপ্রিলে ভারতীয় ঠিকাদারকে হারিয়ে ২৫০ মিলিয়ন ডলারে কাজটি পেয়েছে পেইচিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ। এরপর জুনে বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানিকৃত ৯৭ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেয় চীন। অন্যদিকে, একযুগেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ চলা তিস্তা নদীতে ১ বিলিয়ন ডলারে পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনকে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে এক বাংলাদেশি সাংবাদিকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ বাংলাদেশ। তখন থেকে দুই দেশের মিত্রতা শুরু কিন্তু অনেক বাংলাদেশিই ভারতকে আধিপত্যবাদী ও অহংকারী মিত্র হিসেবেই দেখে। তিনি বলেন, ‘আমরা যে স্বাধীন তা ভারত বিশ্বাস করে না। তারা আমাদের প্রতিটি বিষয়ে নাক গলায়। তারা ভাবে, বাংলাদেশের আমলারা তাদের (ভারতের) জন্য কাজ করে। ভারত সরকারের বিভিন্ন মুসলিমবিরোধী নীতির জন্যও দেশটির প্রতি বাংলাদেশের সন্দেহ বেড়েছে।’

অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাতটি ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ নির্মাণ করে দিয়েছে চীন। ২০১৮ সালে ভারতকে সরিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশটি। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের ২৭টি প্রকল্পে ২০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, (বাংলাদেশের) অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জ্বালানি ও টেলিকম সব জায়গায় এখন চীন ব্যবসা করছে।

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিষয়ের শিক্ষক আলী রিয়াজ বলেন, বড় দাতা হিসেবে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর চেয়ে চীনের সংকোচ কম।

২০১৩ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে করা বাংলাদেশের ১.২ বিলিয়ন ঋণের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে। সঙ্গে সঙ্গেই এই জায়গায় টাকা নিয়ে চীন ঢুকে পড়ে।

আলী রিয়াজ বলেন, গত কয়েক বছরে চীনে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

অর্থনীতিবিষয়ক একটি পত্রিকার রিপোর্টার বলেন, আমার পত্রিকার ৭০ শতাংশ সাংবাদিক চীনে গিয়েছেন। এই রিপোর্টার নিজেও দশ মাসের একটি ফেলোশিপ নিয়ে ২০১৮ সালে চীন ঘুরে এসেছেন। সম্প্রতি যখন করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ল তখন মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইনিজ চিকিৎসকদের একটি দল এ দেশে আসে।

চীনের এসব উদ্যোগে কাজও হচ্ছে বেশ। ভারতের চেয়ে অনেক বেশি পদ্ধতিগতভাবে চীন মুসলিমদের দমিয়ে রাখে। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে চীনে প্রবেশ করতে পারছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ায় চীনের সমালোচনা একেবারেই কম।

তবে এসব নিয়ে বাংলাদেশের সরকার খুব সতর্ক। তারা চীনের কাছে বেশি ঋণী হতে চায় না আবার ভারতের সঙ্গে বেশি বৈরিতাও চায় না। করোনার কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পূর্বনির্ধারিত বাংলাদেশ সফর বাতিল হয় গত মার্চে। পাশেই এত বড় ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর। আলী রিয়াজ বলেন, ভারতের নীতিনির্ধারকরা ও মিডিয়া সবসময়ই মনে করিয়ে দেয় বাংলাদেশ ছোট ও কম গুরুত্বপূর্ণ। তবে চীন তা কখনই করে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত