আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পদক্ষেপের পরও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় থামছে না ইয়াবা কারবার। মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে এখানে ঢুকছে এ মাদক। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগর হয়ে আনোয়ারা উপকূলের বিভিন্ন স্থান দিয়েও আসছে ইয়াবার চালান। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তালিকাভুক্ত এবং এর বাইরে থাকা মাদক কারবারিরা আটক হয়েছে। কিন্তু অধরা থেকে যাচ্ছে অধিকাংশ গডফাদার।
গত শনিবার রাতে উপজেলার দক্ষিণ গহিরা ঘাটকূল এলাকায় অভিযান চালিয়ে মনোয়ারুল ইসলাম (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরে তার ঘর থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ ইয়াবা জব্দ করা হয়। এর পরপরই ওই এলাকার আবদুল শুক্কুরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৯০ হাজার ইয়াবা জব্দ করে কোস্টগার্ড সাঙ্গু স্টেশন। ১৪ সেপ্টেম্বর একই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৩০ ইয়াবা জব্দ করে র্যাব। জব্দ করা এসব ইয়াবা একই চালানের অংশ, যা মিয়ানমার থেকে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মাহমুদুল হাসান মামুন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আনোয়ারা উপকূলের শঙ্খ নদের মোহনায় অবস্থিত দক্ষিণ গহিরা ঘাটকূল এলাকাটি বন বিভাগের প্যারাবনবেষ্টিত। তা ছাড়া ওই এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই নাজুক। এই সুযোগে এলাকাটি ইয়াবা পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে গড়ে তুলেছে স্থানীয় একটি শক্তিশালী চক্র। এই চক্রে রয়েছে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ প্রভাবশালীরা। মিয়ানমার থেকে সাগরপথে ইয়াবা এনে এই পয়েন্ট দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। নৌপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় ইয়াবার বড় চালানগুলো এ পথে পাচার হচ্ছে। পাচারকারীরা কখনো খেতমজুর, কখনো জেলের ছদ্মবেশে ইয়াবা পাচারে লিপ্ত।
গহিরা ঘাটকূল এলাকায় গত দুই দিনের র্যাব ও কোস্টগার্ডের অভিযানে ইয়াবা পাচারের সত্যতা মিলেছে। আনোয়ারা থানায় এই দুই বাহিনীর করা দুটি মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন সরোয়ার আলম (৪৫), আবদুল মজিদ (৫৫), আবদুল শুক্কুর (৪৫), মনোয়ারুল ইসলাম (৪০) ও লেদু মিয়া (৩০)। তাদের বাড়ি ওই এলাকায়। এর মধ্যে সরোয়ার আলম সিন্ডিকেটপ্রধান ও তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
আনোয়ারা থানা সূত্র জানায়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আনোয়ারা থানা পুলিশ, র্যাব-৭ ও কোস্টগার্ড পৃথক অভিযান চালিয়ে ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬০টি ইয়াবা, ৩৪২ লিটার চোলাই মদ, ৬২৭ বোতল বিদেশি মদ, ৭ কেজি ৮৬০ গ্রাম গাঁজা, ১৭ বোতল ফেনসিডিলসহ ১০১ জনকে আটক করে। থানায় মামলা হয়েছে ৮১টি।
বর্তমানে সাগরপথে ইয়াবা পাচার হচ্ছে বেশি। সেখানে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আনোয়ারা থানার ওসি দুলাল মাহমুদ বলেন, ইয়াবা কারবারে যে বা যারাই জড়িত, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মুজিবুর রহমান বলেন, এলাকার জনপ্রতিনিধি বা যে কেউ তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করলে মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। এর পাশাপাশি সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে হবে।
মাদক পাচার কেন বন্ধ হচ্ছে না জানতে চাইলে কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশন) লে. কমান্ডার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ইয়াবাসহ যারা ধরা পড়ছে, তাদের বেশির ভাগই বাহক। মাদক পাচার বন্ধ করতে হলে প্রথমত মাদকের মূল নিয়ন্ত্রকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সিন্ডিকেটগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তালিকায় আনোয়ারায় শতাধিক ইয়াবা কারবারির নাম রয়েছে। এর মধ্যে ২০ ব্যক্তিকে গডফাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন রায়পুরের মোজাহের, আবদুল জলিল ওরফে নুন জলিল, আবদুল মালেক, মো. ওসমান, খোর্দ্দ গহিরার আবুল কাশেম ওরফে আবুল কাছি, মো. সেলিম, ইউসুফ ওরফে কালা মনু, আবু সালাম ওরফে আবু, মো. ওসমান, নুরুল আলম, পরুয়াপাড়ার হাসান মাঝি ওরফে হাসান, নুর সৈয়দ, মো. ইব্রাহিম ওরফে সুরুত ইব্রাহিম, চুন্নাপাড়ার মো. ইসমাইল, পশ্চিমচালের আবদুর রহিম ওরফে রহিম, বাথুয়াপাড়ার সামশুল ইসলাম ওরফে সামশু, বৈরাগের দিদারুল ইসলাম ওরফে দিদার, উত্তর চাতরীর আবদুল করিম, শিলাইগড়ার আবদুর রহিম ও বরুমচড়ার মো. পারভেজ। তাদের মধ্যে পাঁচজন জেলে থাকলেও অন্যরা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন এলাকায় বহাল তবিয়তে আছেন। তাদের অনেকে লোকজন দিয়ে মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, উপজেলার যেসব পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবার চালান পাচার হয়ে আসছে সেগুলো হলো নৌপথে রায়পুরের দক্ষিণ গহিরা ঘাটকূল, বরুমচড়ার ভরাচর, উত্তর জুঁইদ-ীর স্লুইস গেট এবং সড়কপথে তৈলারদ্বীপ সরকারহাট, চাতরী চৌমুহনী বাজার, বটতলী রুস্তমহাট ও পারকি সমুদ্রসৈকত। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে সাঙ্গু গ্যাস ফিল্ডের বাইরে বেশির ভাগ ইয়াবা চালানের হাতবদল হয় বলে জানা গেছে।
