যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের বিতর্ক

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২০, ০৩:০১ এএম

গত ২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রথম বিতর্ক। নির্বাচনের আগে আরও দুটি বিতর্কে অংশ নেবেন তারা। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীর মুখোমুখি বিতর্কের মধ্য দিয়েই জমে ওঠে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনে জয়-পরাজয়েও ভূমিকা রাখতে পারে এই বিতর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিতর্ক কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠল, লিখেছেন পরাগ মাঝি

বিতর্কে ওলট-পালট

১৯৬০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বিতর্কে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। ওই দুই প্রার্থীর মধ্যে একজন ছিলেন রিপাবলিকান দলের রিচার্ড নিক্সন আর অন্যজন হলেন ডেমোক্র্যাট-দলীয় জন এফ কেনেডি। শিকাগোর একটি স্টুডিওতে বিতর্কটি অনুষ্ঠিত হয়। এই বিতর্কে অংশ নেওয়া রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের জন্য এক অনুতাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ বিতর্কের পরের জনজরিপগুলোতে তিনি পিছিয়ে পড়েছিলেন।

সেবার বিতর্ক অনুষ্ঠিত হওয়ার মাসখানেক আগেই গাড়ির দরজায় হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছিলেন রিচার্ড নিক্সন। এই ব্যথায় সংক্রমণ দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে। প্রায় দুই সপ্তাহ অবস্থান করে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরই আসে বিতর্কের দিনটি। ক্যামেরার সামনেও তাকে বেশ রুগ্ণ দেখাচ্ছিল। প্রায় সাড়ে চার কেজি ওজন কমে গিয়েছিল তার। একটি ধূসর রঙের কোট পরেছিলেন। কিন্তু সাদা-কালো সম্প্রচারের সেই যুগে টেলিভিশনে নিক্সনের গায়ের কোটটিকে বেশ অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। অন্যদিকে, গায়ের কালো কোট আর মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে সহজেই মার্কিন দর্শকদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন নিক্সনের প্রতিদ্বন্দ্বী জন এফ কেনেডি। বিতর্কের আগের মাসাধিককাল জুড়ে রৌদ্রোজ্জ্বল ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই বক্তব্য উপস্থাপন আর শারীরিক অভিব্যক্তিতে তার চাঙা মনোভব মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। এদিকে, নিক্সন ছিলেন বেশ নি®প্রভ। তিনি ক্যামেরার দিকে না চেয়ে প্রশ্নকারী সাংবাদিকদের দিকে চেয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। ফলে দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে তিনি ব্যর্থ হন।

সেদিনের সেই বিতর্ক ছিল মার্কিন ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। টেলিভিশনের পর্দায় সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি মানুষ বিতর্কটি প্রত্যক্ষ করেছিল। বিতর্ক অনুষ্ঠিত হওয়ার আগের জরিপগুলোতে কেনেডির চেয়ে নিক্সন বেশ এগিয়ে থাকলেও বিতর্কের পরের দিনের জরিপে দেখা যায় নিক্সনকে সামান্য ব্যবধানে টপকে গেছেন কেনেডি! এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় লাভ করে মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কেনেডি। একটি জরিপে অন্তত ৬ শতাংশ ভোটার দাবি করেছিলেন যে, টেলিভিশন বিতর্কে কেনেডির অভিব্যক্তিতে মুগ্ধ হয়েই তারা তাকে ভোট দেন।

আরেকটি ব্যাপার হলো নিক্সন আর কেনেডির বিতর্ক যারা রেডিওতে শুনেছিলেন, তারা অনেকেই ভেবেছিলেন বিতর্কে জয় লাভ করেছেন রিচার্ড নিক্সন। আর টেলিভিশনে যারা বিতর্কটি দেখেছিলেন, তারা জন এফ কেনেডিকে এগিয়ে রেখেছিলেন। সে সময় ২ হাজার ১০০ মানুষের মধ্যে একটি জরিপ চালিয়ে দেখা যায় তাদের মধ্যে মাত্র ২৮২ জন রেডিওর মাধ্যমে বিতর্কটি শুনেছিলেন আর বাকি সবাই টেলিভিশনে এটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই এদিক থেকেও এগিয়ে ছিলেন কেনেডি।

১৯৬০ সালে জন এফ কেনেডির কাছে হেরে গেলেও ১৯৬৮ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় লাভ করেন রিচার্ড নিক্সন। আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার জন্যই সেবার তিনি প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে অংশ নেওয়ার বিরোধী ছিলেন।

যেভাবে শুরু

অনেকেই মনে করেন ১৮৫৮ সালে আব্রাহাম লিঙ্কন ও স্টিফেন ডগলাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাতটি বিতর্ক থেকেই আজকের দিনের মার্কিন প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কের উদ্ভব। সেবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়, ইলিনয়ের সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন ডগলাস ও লিঙ্কন। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছিলেন লিঙ্কন। অন্যদিকে দাসপ্রথার পক্ষে ছিলেন ডগলাস। বিতর্কে ছিল না কোনো মডারেটর কিংবা বিচারক প্যানেল। তাই জয়-পরাজয়েরও কোনো ব্যাপার ছিল না। সাতটি বিতর্ক জনগণই বিচার-বিশ্লেষণ করেছিল। সেবার সিনেট নির্বাচনে ডগলাসের কাছে আব্রাহাম লিঙ্কন হেরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাতটি বিতর্কে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে তিনি যেসব যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেছিলেন, আমেরিকা জুড়ে সেগুলো আলোড়ন তোলে। এই আলোড়নের মধ্য দিয়ে মাত্র দুই বছরের মধ্যে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হন লিঙ্কন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ডগলাসকেই মনোনয়ন দেন ডেমোক্র্যাটরা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে কোনো বিতর্ক অনুষ্ঠিত না হলেও ১৮৬০ সালের সেই নির্বাচনে ডগলাসকে হারিয়ে ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লিঙ্কন।

এরপরের ১৫টি নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা সামনা-সামনি কোনো বিতর্কে অংশ নেননি। নিজেদের নির্বাচনী প্রচারণাগুলোতেই তারা একে অপরের বিরোধিতা ও যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেছেন। তবে ১৯৪৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য রিপাবলিকান দলীয় দুই প্রার্থী থমাস ডিউয়ে এবং হ্যারল্ড স্টাসেনের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করা হয়। আমেরিকায় সমাজতন্ত্র নিষিদ্ধ করার পক্ষে-বিপক্ষে তারা বিতর্ক করেছিলেন। সেই বিতর্কটি রেডিওতে সম্প্রচার করা হলে প্রায় পাঁছ-ছয় কোটি মানুষ এটি শুনেছিল।

১৯৫২ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের নিয়ে একটি টেলিভিশন বিতর্কের আয়োজন করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘লিগ অব ওম্যান ভোটারস’ (এলডব্লিউভি)। তবে সেই বিতর্কে দুই প্রধান দলের দুজন নয়, বরং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সব প্রার্থীকেই এক মঞ্চে নিয়ে আসা হয়।

১৯৬০ সালে কেনেডি-নিক্সন বিতর্কের মধ্য দিয়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিতর্ক অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে, বিতর্কের মধ্য দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেও জন এফ কেনেডি মাত্র দুই বছরের মধ্যেই আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পরই ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২ বছর পর ১৯৬৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন লিন্ডন। কিন্তু সেবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রিপাবলিকান দলীয় বেরি গোল্ডওয়াটারের সঙ্গে একই মঞ্চে বিতর্কে অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। ১৯৬৮ সালে একইভাবে বিতর্ক প্রত্যাখ্যান করেছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সন। আট বছর আগে জন এফ কেনেডির কাছে তিনি পরাজিত হলেও সেবার আবারও তিনি রিপাবলিকানদের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে জয় লাভ করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৭২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির ঘটনায় ১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। নিক্সনের পদত্যাগের পর তার স্থলাভিষিক্ত হন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড। ১৯৭৬ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিমি কার্টারের সঙ্গে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। সেবারের নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করেছিল ‘লীগ অব ওম্যান ভোটারস’। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে আমেরিকার সবগুলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই প্রধান দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। নির্বাচন এলেই এখন মার্কিন ভোটাররা দুই প্রার্থীর মধ্যে একটি জম্পেশ বিতর্কের জন্য মুখিয়ে থাকেন। মার্কিন নির্বাচনে বিতর্ক এখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই স্বীকৃত।

এ বছরও প্রধান দুই দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে তিনটি এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীদের মধ্যে একটি বিতর্কের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের মধ্যকার প্রথম বিতর্ক অনুষ্ঠানটি।

দ্য লিগ অব ওম্যান ভোটারস

মার্কিন প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনের প্রথম আয়োজক দেশটির ‘দ্য লিগ অব ওম্যান ভোটারস’ (এলডব্লিউভি)। আমেরিকার ইতিহাসে নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯২০ সালে এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে। ১৯৭৬ সালে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্টের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করেছিল এই সংগঠন। তবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এলডব্লিউভির বিতর্কের আয়োজন এটাই প্রথম ছিল না। এর আগে ১৯৫২ সালে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সব প্রার্থীকে নিয়ে বিতর্কের আয়োজন করে তারা। পরে ১৯৬০ সালে রিচার্ড নিক্সন ও কেনেডির মধ্যকার প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখলেও ১৯৭৬ সালে দুই প্রার্থীর মধ্যে বিতর্ক আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিতর্ককে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তারাই প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

তবে, ১৯৮৮ সালের নির্বাচন থেকে এখন পর্যন্ত সবগুলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই আয়োজকের ভূমিকায় আছে ‘কমিশন অন প্রেসিডেনশিয়াল ডিবেটস’ (সিপিডি)। এ সময়ের মধ্যে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিতর্ক আয়োজন করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি। প্রত্যেক নির্বাচনেই প্রধান দুই দলের মনোনীত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের নিয়ে তিন থেকে চারটি বিতর্কের আয়োজন করে সিপিডি। বিতর্ক অনুষ্ঠিত হওয়ার অন্তত এক বছর আগেই বিতর্কের স্থান, সময় ও মডারেটরদের নাম ঘোষণা করা হয় কমিশনের পক্ষ থেকে।

বর্তমানে দুই প্রধান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে পার্টি পর্যায়েও প্রার্থী মনোনয়নের জন্য আগ্রহীদের মধ্যে বিতর্কের আয়োজন করা হয়। তবে সেই বিতর্কের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা থাকে না সিপিডির।

বিতর্কে জয়-পরাজয়

মার্কিন প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনের বিতর্কে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মূলত বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের নিজস্ব মতামত ও চিন্তাভাবনা বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক দিয়ে তুলে ধরেন। তাই এই বিতর্কে সঠিক উত্তর বা ভুল উত্তর বলে কিছু নেই। কিন্তু তারপরও এই বিতর্কে জয়-পরাজয় কীভাবে নির্ধারিত হয়?

আসলে এই বিতর্কে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা হয় উপলব্ধির মধ্য দিয়ে। বিতর্ক মঞ্চে কাউকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয় না। বিভিন্ন টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষকরা বিতর্ক দেখে তাদের নিজস্ব মতামত দেন। যেখানে তারা এক প্রার্থীকে অন্য প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে রাখেন। তাই জয়-পরাজয়ের হিসাবটি সংবাদমাধ্যমভেদে বিভিন্ন হতে পারে। বিতর্কে অংশ নেওয়া দুই প্রার্থীর বক্তব্যকে খুব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। এসব বিশ্লেষণ পড়ে ও সরাসরি বিতর্ক দেখে ভোটারদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়, ভোটকেন্দ্রে তার প্রতিফলন ঘটে।

বিতর্ক চলার সময় প্রার্থীদের আচরণ বিশ্লেষণ করেও জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম। ১৯৯২ সালের বিতর্কে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বারবার তার ঘড়ি দেখছিলেন। বিতর্ক ছেড়ে যাওয়ার এই মনোভব দেখে এটা সহজেই অনুমান করা গিয়েছিল যে, তিনি পরাজিত হয়েছেন।

বিতর্কের পরে অনেক সময় বিতর্কের চটকদার ও বিব্রতকর বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমে প্রাধান্য পায়। আবার অনেক সময় সত্যকে ছাপিয়ে প্রতিক্রিয়াগুলোই মুখ্য হয়ে ওঠে। ১৯৮৮ সালের প্রেসিডেন্ট বিতর্কে ৪০ বছর বয়সী ড্যান কোয়েল যখন বলেন যে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে কংগ্রেসে জন এফ কেনেডির যতটা অভিজ্ঞতা ছিল, সেটা তারও আছে তখন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী লইড বেন্টসেন তাকে ধরাশায়ী করে ফেলেন। তিনি বলেন, আমি জ্যাক কেনেডির সঙ্গে কাজ করেছি। আমি জ্যাক কেনেডিকে চিনতাম। জ্যাক কেনেডি আমার বন্ধু ছিলেন। বেন্টসেন কোয়েলকে উদ্দেশ করে আরও বলেন সিনেটর, আপনি মোটেও জ্যাক কেনেডি নন।

১৯৮৪ সালের বিতর্কে হঠাৎ করেই আলোচনার ইস্যু হয়ে ওঠে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রোনাল্ড রিগ্যানের বেশি বয়সের প্রসঙ্গটি। এর প্রতি-উত্তরে রিগ্যান মডারেটরকে উদ্দেশ করে বলে বসেন, ‘আপনাকে জানাতে চাই যে, এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় বয়সকে আমি ইস্যু করব না। রাজনৈতিক কারণে আমার প্রতিপক্ষের কম বয়স আর অনভিজ্ঞতাকে আমি পুঁজি করব না।’ তার এই বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক প্রার্থী ওয়াল্টার মন্ডেলসহ উপস্থিত সবাই হেসে ওঠেন।

বিতর্কে স্মরণীয় উক্তি করার ক্ষেত্রে রিগ্যান ছিলেন তুখোড়। বলা হয়ে থাকে যে প্রশ্নটি করার মাধ্যমে তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, সেটি হলো ‘চার বছর আগের চেয়ে আপনি এখন কি ভালো আছেন? ’

এবার দুই প্রার্থীর মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে ও জো বাইডেনকে এগিয়ে রেখেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। বিতর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করার অভিযোগ এনেছে সিএনএন।

লিঙ্কন-ডগলাস বিতর্ক থেকে এখনকার বিতর্ক অনেক দিক থেকেই আলাদা। তিন ঘণ্টা সময়ের মধ্যে প্রত্যেক প্রার্থী একটানা এক ঘণ্টা বা আরও বেশ সময় ধরে বক্তব্য দেওয়ার বদলে এখনকার প্রার্থীরা টেলিভিশনে ৯০ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিকদের সঙ্গে পালাক্রমে কথা বলেন। লাখ লাখ মানুষ এই বিতর্ক টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি দেখতে পারে। বিতর্কের আগে ও পরে প্রার্থীদের বক্তব্য ও তাদের প্রতি দর্শকদের প্রতিক্রিয়াগুলো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত