বিশ্বের কোথাও কোনো শিশুর অকাল মৃত্যু তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। তিনি বলেন, ‘শিশুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা সরকার নিচ্ছে। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে অত্যাচার-নির্যাতন, কোনো কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে যেন এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেদিকে আমরা বিশেষ দৃষ্টি দিচ্ছি। আমরা চাই, আমাদের শিশুরা নিরাপদ থাকবে, সুন্দরভাবে বাঁচবে এবং মানুষের মতো মানুষ হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সোমবার সকালে ‘বিশ্ব শিশু অধিকার দিবস এবং শিশু অধিকার সপ্তাহ ২০২০’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত হন।
শেখ হাসিনা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট কালরাতে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার ১০ বছরের ছোট ভাই শেখ রাসেল, রাসেলের খেলার সাথী ফুপাতো ভাই ১০ বছরের আরিফ, ফুপাতো ভাইয়ের ৪ বছরের ছেলে সুকান্ত, ১৩ বছরের ফুপাতো বোন এবং তাদের বাসার গৃহপরিচারিকার ছেলে ৫-৬ বছরের পটকার নির্মম হত্যাকান্ড স্মরণ করে বলেন, ‘কোনো শিশুর অকাল মৃত্যু আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। সেটা আমার দেশেই হোক বা অন্য দেশেই হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, এ পৃথিবীটা শিশুদের জন্য নির্ভরযোগ্য, শান্তিপূর্ণ, বাসযোগ্য স্থান হোক। যেখানে প্রতিটি শিশুর একটি ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে। শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ, কাজেই সঠিকভাবে তাদের মেধা ও জ্ঞানকে বিকাশের সুযোগ আমাদেরই করে দিতে হবে। সেজন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি।’
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের ওপর শিশুদের আঁকা নির্বাচিত ছবি নিয়ে ‘আমরা এঁকেছি ১০০ মুজিব’ এবং নির্বাচিত লেখা নিয়ে ‘আমরা লিখেছি ১০০ মুজিব’সহ শিশুদের লেখা বইয়ের (২৫টি বইয়ের সিরিজ) মোড়ক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শিশুদের পরিবেশিত বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেছা ইন্দিরা, বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি বিরা মেন্ডোনকা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনাম। নাবিদ রহমান তুর্য ও হৃদিকা নূর সিদ্দিক শিশু একাডেমির শিশুদের পক্ষে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
‘করোনাভাইরাসের কারণে একটা সমস্যা এখন দেখা দিয়েছে যে, স্কুল খোলা যাচ্ছে না এবং বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না, সত্যিই সেটা খুব কষ্টের, কারণ ঘরের মধ্যে বসে থেকে কী করবে তারা’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার ৯ মাসের মধ্যে জাতির পিতা আমাদের যে সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন, সেখানেই শিশু অধিকারের কথা বলা আছে। শুধু তাই নয়, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ তিনি গড়ে তুলছিলেন। চারদিকে অভাব-অনটন অথচ এর মধ্যেও প্রাথমিক শিক্ষাকে তিনি সরকারিকরণ করে সম্পূর্ণ অবৈতনিক করে দেন। শিশু বয়স থেকেই আমাদের শিশুরা যাতে লেখাপড়া করতে পারে সে সুযোগ বঙ্গবন্ধু করে দিয়েছিলেন এবং ১৯৭৪ সালে শিশু অধিকার আইন ও নীতিমালা করে শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দেশের মানুষ ২১ বছর অবহেলিত ছিল। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে শিশুদের জন্য প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থাসহ জাতীয় শিক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করে। তিনি বলেন, জাতির পিতার প্রণীত শিশু আইনের আলোকে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় শিশু শ্রমনীতি ২০১০, জাতীয় শিশুনীতি ২০১১ এবং শিশু আইন ২০১৩ প্রণয়ন করে শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
শেখ হাসিনা বলেন, সারা জীবন মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে জীবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটানোয় নিজেরা বাবার স্নেহ বঞ্চিত ছিলেন, যদিও শিশুদের জাতির পিতা অত্যন্ত পছন্দ করতেন। যে কারণে ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিনকে সরকার জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে।
প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার বক্তৃতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তিনি (বঙ্গবন্ধু) সবসময়ই ছাত্রছাত্রীদের বলতেন, ‘লেখাপড়া করো। মানুষ হও। ভালো মানুষ না হলে ভালো দেশ গড়া যাবে না।’
আজকের শিশুরা যেন মানুষের মতো মানুষ হতে পারে সেজন্য মানসম্পন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ের মাধ্যমে তার সরকার বহুমুখী শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি। সেই স্বাধীনতার সুফল প্রত্যেকটি মানুষের ঘরে পৌঁছাক। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে বিশ্বসভায় চলবে, সেটাই আমরা চাই।’
তিনি বলেন, ‘আজকের শিশুরা সেভাবেই নিজেদের গড়ে তুলবে। কিছু সমস্যা আসবে। কিন্তু সেগুলোকে মোকাবিলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’ তিনি কবি সুকান্তের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেন ‘এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
