পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল প্রথম শ্রেণির পদের জন্য। নিয়োগ পেয়ে নিয়ম অনুযায়ী তিনি নবম গ্রেডে এ পদে যোগ দেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই এ কর্মকর্তা ষষ্ঠ গ্রেড পেতে সংস্থাটিতে একটি আবেদন করেন। সেই আবেদন প্রথম দফায় সংস্থাটির সচিব নাকচ করে দেন। তারপরও হাল ছাড়েননি তিনি। পুনরায় ষষ্ঠ গ্রেডের জন্য আবেদন করেন। এবার পদোন্নতি বা অন্য কোনো বিধিবিধান না মেনেই তাকে ষষ্ঠ গ্রেড অনুযায়ী বেতন দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। দফায় দফায় এ বিষয়ে অডিট আপত্তি আসে। কিন্তু বরাবরই তা ধামাচাপা দেওয়া হয়। ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আবাসিক মেডিকেল অফিসার সাথী খানম নামে এ চিকিৎসকের বেলায়। তিনি বর্তমানে আরও এক ধাপ এগিয়ে নাজিরাবাজার মাতৃসদনে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। যদিও ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা ছাড়া এ পদে কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। সম্প্রতি এসব বিষয়ে সেখানকার আরেক চিকিৎসক তাহমিনা সিদ্দিকা ডিএসসিসির মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
ডিএসসিসি কর্মকর্তারা জানান, নাজিরাবাজার মাতৃসদনের আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদে জনবল নিয়োগ দিতে ২০০৮ সালের ৫ জানুয়ারি অবিভক্ত সিটি করপোরেশন একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেয়। সে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী পদটি ছিল নবম গ্রেডের। শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, ‘স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস পাস এবং আবাসিক সার্জন বা আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে এক বৎসরের বাস্তব অভিজ্ঞতা।’ এরপর শর্ত শিথিল করে ২২ জানুয়ারি আবারও সংশোধিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সেখানে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস পাস এবং গাইনি ও অব্সটেট্রিক্সে ন্যূনতম এক বছরের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। প্রস্তাবিত জনবল নিয়োগের মূল তফসিল অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় ২০০৮ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও তার সংশোধনী অনুযায়ী আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কমানো হয়। সেই সঙ্গে বেতন ক্রম নবম গ্রেড থেকে ষষ্ঠ গ্রেড করা হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে এক আবেদনের পর ভূতাপেক্ষভাবে কাজে যোগদানের তারিখ থেকে ডা. সাথী খানমকে নবম গ্রেডের স্থলে ষষ্ঠ গ্রেডের বেতন স্কেল মঞ্জুর করা হয়। ফলে নবম গ্রেডের এ কর্মকর্তা ষষ্ঠ গ্রেডে বেতন উত্তোলন করে সংস্থাটির বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ নিয়েছেন।
ডিএসসিসির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, এমবিবিএস পাস এবং এক বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাথী খানম নবম গ্রেডের আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থী হন। তিনি ২০০৮ সালের ১৪ জুলাই এ পদে যোগদান করেন। একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি আবেদন করেন। আবেদনের পর সংস্থাটির তৎকালীন সচিব বিএম এনামুল হক ২০ সেপ্টেম্বর এক চিঠিতে বলেন, ‘স্নাতকোত্তর শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন না করায় তার (সাথী খানম) আবেদন বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই।’ এরপর ২৩ অক্টোবর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পুনরায় আবেদন করেন তিনি। ইতিমধ্যে সিটি করপোরেশনের সচিব পদে আরেক কর্মকর্তা যোগ দেন। এবার সংস্থাটিতে যোগ দেওয়া সচিব মো. সামসুজ্জামান আরেকটি অফিস আদেশ জারি করেন। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর জারি করা এ আদেশে বলা হয়, ‘আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সাথী খানমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার নিয়োগ আদেশের ৬,৮০০-১৩,০৯০ টাকার পরিবর্তে ১১,০০০-১৭,৬৫০ (২০০৫ জাতীয় বেতনস্কেল অনুযায়ী) টাকা প্রদান করা হলো; যা তার কাজের যোগদানের তারিখ থেকে কার্যকর হবে। তবে শর্ত থাকে যে, ভবিষ্যতে কোনো অডিট বা অন্য কোনো বিধিগত আপত্তি উত্থাপিত হলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি তার দায়ভার বহন করবেন এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন।’
এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরের নিরীক্ষা পরিদর্শন প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদ-৫৫ বলা হয়, ‘বিধিবহির্ভূতভাবে ডা. সাথী খানমকে উচ্চতর স্কেল প্রদান করায় বেতন ভাতাদি বাবদ ১০ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭ টাকা টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে অডিট আপত্তি আসে। অডিট প্রতিবেদনে ওই টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য করপোরেশনকে বলা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাথী খানম সরকারি কোষাগার থেকে ২০ লাখ টাকারও বেশি অতিরিক্ত নিয়েছেন।
ডিএসসিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২০১৬ সালের ১৬ জুন নাজিরাবাজার মাতৃসদনে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সাথী খানমকে তার আবেদনের পরিপ্রক্ষিতে মহানগর জেনারেল হাসপাতালে স্ব-বেতনে বদলি করা হয়। বদলিকৃত কর্মস্থল থেকে তিনি বেতন ও ভাতাদি প্রাপ্য হবেন বলেও উল্লেখ করা হয়। সেখানে তাকে মেডিকেল অফিসারের রোস্টার ডিউটি পালন করতে দেওয়ায় তিনি প্রভাব বিস্তার করে তিন মাসের মাথায় নাজিরাবাজার মাতৃসদনে আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে বদলি হয়ে আসেন। মহানগর জেনারেল হাসপাতালের পদটিও নবম গ্রেডভুক্ত ছিল। কিন্তু নাজিরাবাজার মাতৃসদনের উপপরিচালক কাম-পরামর্শক (গাইনি) পদে নিজ বেতনে সংযুক্ত করার পর তিনি পঞ্চম গ্রেডভুক্ত পদের চেয়ারে বসেন। যদিও পদোন্নতি ব্যতীত এ পদে বসার কোনো সুযোগ নেই।
ডিএসসিসির প্রশাসন শাখায় কর্মরত কর্মকর্তারা জানান, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তাকে উচ্চতর পদের দায়িত্ব দিতে হলে জ্যেষ্ঠতা ও কর্মদক্ষতা বিবেচনা করে চলতি দায়িত্ব প্রদান করতে হয়। কিন্তু সাথী খানমকে সরাসরি পদায়ন করা হয়েছে, যা পদোন্নতি ব্যতীত সম্ভব নয়। বিধিমতে নাজিরাবাজার মাতৃসদনের মেডিকেল অফিসার ডা. শাহ্ তাহমিনা সিদ্দিকার জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী এ পদে থাকার কথা।
তারা আরও জানান, ডা. সাথী খানমের স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের পদস্থ কর্মকর্তা। ফলে তিনি প্রভাব বিস্তার করে এ বিষয়ে সব সময়ই করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাখেন।
এ বিষয়ে ডা. শাহ তাহমিনা সিদ্দিকা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিধান অনুযায়ী আমার উপপরিচালক হওয়ার কথা। ২০১৮ সালে আমি এ পদে ছিলাম। সেখানে অবৈধভাবে নবম গ্রেডের কর্মকর্তা ডা. সাথীকে বসানো হয়েছে। আমি এ বিষয়ে মেয়রের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছি। আশা করি ন্যায়বিচার পাব।’ তবে এ বিষয়ে জানতে মোবাইলে ফোন করা হলে বিস্তারিত শোনার পর ডা. সাথী খানম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। সব বিষয়ে এখনো অবগত নই। বিষয়টি নোট করে নিয়েছি, বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’
