বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকার দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ২৬ হাজার ৩০৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা ধার করেছে। অপর দিকে একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ২৩ হাজার ২৭০ কোটি ৩২ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এর ফলে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণও কমেছে।
চলতি প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২৬ হাজার ৬৫৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ কমেছে ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত সঞ্চয়পত্র বিক্রি বৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায় বাড়ায় ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সরকারের ঋণ পরিশোধ বাজারে অর্থ সঞ্চালন হ্রাস করবে বলেও জানান তারা।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে দেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লক্ষণীয় হারে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে বাজারে অর্থ সঞ্চালন হ্রাস মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার কর্তৃক বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণ পরিশোধ ইতিবাচক। কারণ এর ফলে বাজার থেকে হাই পাওয়ারড মানি কমিয়ে দেয়। মূল্যস্ফীতিতে হাই পাওয়ারড মানির প্রভাব রয়েছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন নীতি সহায়তা ও রিজার্ভ বাড়ার ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। রিজার্ভ বৃদ্ধির বিপরীতে বাজারে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বেশিরভাগ এলাকায় বন্যার কারণে সরকারের ব্যয় হ্রাসের কারণে নিট ঋণগ্রহণের পরিমাণ কমেছে বলে মনসুর মনে করেন। এছাড়া এ সময়ে সরকার কিছু বিদেশি ঋণও পেয়েছে, যা ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করছেন। অবশ্য চলতি অর্থবছরের পরবর্তী মাসগুলোতে সরকারকে যখন বেশি ব্যয় করতে হবে, তখন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের পরিমাণও বাড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ২৩ হাজার ২৭০ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধের পরও সরকারের হিসাবে এখনো ১২ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত রয়েছে। ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ঋণের সুদ ৯ শতাংশ বাস্তবায়নের পর আমানতকারীরা ব্যাংকগুলোর সুদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।
২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট প্রান্তিকে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দ্বিগুণ বেড়েছে। এ সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ৭ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। চলতি প্রথম প্রান্তিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা কমেছে। এ সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। এ সময়ে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা। তবে দুই মাসের মধ্যে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে রাজস্ব আহরণ ইতিবাচক ধারায় প্রবেশ করেছে।
এসব কারণে সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ কমে ২১ হাজার ৮৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা তিন মাস আগেও ছিল ৪৪ হাজার ৩৫৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অন্যদিকে একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণ ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৬৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। আর ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যেখানে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে।
