জালিয়াতি: টিভি দেখার জন্য টাকা দেওয়া হয় ভারতে!

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২০, ১২:৩৩ পিএম

টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট বা টিআরপি বলে দেয় দর্শক কোন চ্যানেল ও কোন ধরনের অনুষ্ঠান দেখছে বেশি। সেই সব অনুষ্ঠান বা চ্যানেলের বিজ্ঞাপনের বাজারও বড় হয় দিন দিন।

এবার ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টিআরপি জালিয়াতির ঘটনা এসেছে মুম্বাই পুলিশের নজরে।

বলা হচ্ছে, কোনো নির্দিষ্ট চ্যানেল দেখার জন্য দর্শকদের টাকা দেওয়া হতো। এই জালিয়াতিতে ইংরেজি খবরের চ্যানেল ‘রিপাবলিক টিভি’ও আছে বলে পুলিশের দাবি।

বিবিসি জানায়, চ্যানেলটির প্রধান সম্পাদক অর্ণব গোস্বামী অবশ্য এই জালিয়াতিতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে পুলিশকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন।

মুম্বাই পুলিশ বলছে, হানসা নামের যে সংস্থাটি টিভি চ্যানেলগুলোর জনপ্রিয়তা মাপার জন্য দর্শকদের বাড়ির টিভি সেটে একটি ছোট যন্ত্র বসিয়ে দেয়, তাদের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে এই বড়সড় জালিয়াতি চক্র ধরতে পেরেছে।

দুটি মারাঠি চ্যানেলের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং রিপাবলিক টিভিকে জেরা করা হবে।

মুম্বাইয়ের পুলিশ কমিশনার পরমভীর সিং বলছেন, হানসা নামের একটি এজেন্সি, যারা মানুষের বাড়ির টিভি সেটে জনপ্রিয়তা মাপার যন্ত্র বসিয়ে দেয়, তাদের কয়েকজন কর্মী গোপন নথি চ্যানেলগুলোর কাছে পাচার করে দিচ্ছিলেন।

ওই সংস্থাটির অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়েই পুলিশ এই জালিয়াতির খোঁজ পেয়েছে।

পরমভীর বলেন, “আমরা যখন সেই সব বাড়িতে যোগাযোগ করি, যাদের তথ্য হানসার সাবেক কর্মীরা পাচার করে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ, ওই সব বাড়ির লোকেরাই জানায় যে টিভি চ্যানেলের প্রতিনিধিরা তাদের প্রতি মাসে প্রায় পাঁচশো টাকা করে দেয় রিপাবলিক টিভি চ্যানেলটি চালিয়ে রাখার জন্য।”

“অদ্ভুতভাবে এমন বাড়িও আমরা পেয়েছি, যারা হয়তো নিরক্ষর, কিন্তু তাদের বাড়িতেও ইংরেজি খবরের চ্যানেল চলছে— সে তারা বাড়িতে থাকুন বা না থাকুন।”

“অর্থ দিয়ে টিআরপিতে কারসাজি করা হচ্ছিল। এটা স্পষ্টতই বিশ্বাসভঙ্গ ও ৪২০ ধারা অনুযায়ী জালিয়াতি,” বলেন এ পুলিশ কমিশনার।

ভারতে প্রায় ৪৪ হাজার বাড়িতে টিভির ভেতরে ‘পিপল মিটার’ বা ‘ব্যারোমিটার’ নামের একটি ছোট যন্ত্র লাগানো আছে। ওই যন্ত্র থেকেই তথ্য পাওয়া যায় যে কোন বাড়িতে কোন চ্যানেল কতক্ষণ ধরে দেখা হচ্ছে।

ভারতের সরকারি সংস্থা প্রসার ভারতীর সাবেক প্রধান জহর সরকার বলেন, “সারা দেশে প্রায় লাখ তিনেক পরিবারকে বাছা হয় আর্থ সামাজিক অবস্থানসহ আরও নানা বিষয়ের ওপরে ভিত্তি করে। সেখান থেকে কম্পিউটার বেছে নেয় ৪৪ হাজার বাড়ি, যেখানে ব্যারোমিটার বসানো হবে।”

সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারিকে তিনি ‘জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, “এখন এটা আমি জানি না যে পুলিশ কত বাড়িতে যোগাযোগ করেছিল। সেটা যদি ৫০-১০০ হয়, তাহলে মোট টিআরপি-র ওপরে খুব একটা বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। কিন্তু সংখ্যাটা যদি কয়েক হাজার হয়, তাহলে বিষয়টা নিশ্চয়ই খুব চিন্তার।”

মুম্বাই পুলিশ বলছে, টিআরপি দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হয়েছে, সেটাও অপরাধী কার্যকলাপ থেকে প্রাপ্ত অর্থ।

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত অনেকের কাছেই এটা জানা ছিল যে টিআরপিতে কারসাজি করা হয়ে থাকে। কিন্তু সেটা পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি চ্যানেলের নয়— গোটা সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই এখন মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারেন বলে মন্তব্য করছিলেন ঢেঙ্কানলের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব মাস কমিউনিকেশনসের সহকারী অধ্যাপক সম্বিৎ পাল।

তার কথায়, “এই ঘটনার দুটো দিক আছে। একে তো টিআরপি-তে জালিয়াতি করা হলে সেটা সরাসরি বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপরে প্রভাব ফেলবে। তারা অ্যাড দিতে চাইবে না। আর সাধারণ মানুষ তো সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তের পরে এমনিতেই বলে যে মূলধারার গণমাধ্যমে সব সময়ে সত্যি খবর দেখানো হয় না। এখন তাদের সেই সন্দেহটা আরও বাড়বে।”

“তারা একটা সন্দেহ করার সুযোগ পেয়ে গেল যে টিভি চ্যানেলগুলো নিজেদের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেই যদি সত্য কথা না বলে, তাহলে তারা যে অন্যান্য খবরের ক্ষেত্রে সত্যি কথা বলছে, তার প্রমাণ কী?” এ আশঙ্কাও প্রকাশ করলেন সম্বিৎ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত