নিরাপত্তায় একগুচ্ছ পরিকল্পনা

পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাবের ক্যাম্প হচ্ছে রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২০, ০৩:২১ এএম

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খুনোখুনিসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় উদ্বিগ্ন সরকার। গত তিন বছরে বিভিন্ন ঘটনায় ৮০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। এখনো মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে বলে পুলিশ তথ্য পেয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি করতে ক্যাম্পের নিরাপত্তায় একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। রোহিঙ্গাদের নিয়ে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে একটি  জরুরি বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ ও র‌্যাব সদর দপ্তরেও বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে বৈঠক হয়েছে। ইতিমধ্যে কঠোর নিরাপত্তা ও নজরদারি রক্ষায় ক্যাম্পের চারদিকে কাঁটাতারের বেড়ার আওতায় আনা হয়েছে। বেড়া তৈরির কাজ শুরুও হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, পাশাপাশি ক্যাম্পের ভেতরে পুলিশ-র‌্যাব ও বিজিবির যৌথ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ক্যাম্পের ভেতরে থাকা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। ভ্রাম্যমাণ আদালতও বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃহস্পতিবার সচিবের নেতৃত্বে একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে বিজিবি ও র‌্যাবের ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারদিকে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা দেবে। আর এ কাজটি সম্পন্ন করবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। তিনি আরও বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সমন্বয়ে যৌথ ক্যাম্প স্থাপন করা হবে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হবে। এটি বাস্তবায়ন করবে পুলিশ সদর দপ্তর ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার। সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করতে উখিয়া হতে টেকনাফ পর্যন্ত রাত্রিকালীন যৌথ টহল অব্যাহত থাকবে। রোহিঙ্গারা যাতে পাসপোর্ট ও জাতীয় ন্যাশনাল কার্ড (এনআইডি) ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে যেসব রোহিঙ্গার পাসপোর্ট সংগ্রহের পেছনে যারা কাজ করেছে তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া পাসপোর্টের মেয়াদ যাতে কেউ বৃদ্ধি করতে না পারে সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শিবিরগুলোতে তারা বসবাস করছে। তাদের ভালো পরিবেশে রাখতে নোয়াখালীর ভাসানচরে একটি আবাসন পল্লীও গড়ে তোলে সরকার। রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত নিতে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মহল চাপ দিচ্ছে মিয়ানমারকে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হতে দেওয়া হবে না। সম্প্রতি ক্যাম্পের ভেতরে যে কটি হত্যাকান্ডসহ অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে তার তদন্ত করা হচ্ছে। ওইসব ঘটনায় যারাই জড়িত আছে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিরাপত্তা বাড়াতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যারা অপরাধ করবে তাদের গ্রেপ্তার করে প্রচলিত আইনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। রোহিঙ্গা অপরাধীদের কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।

গত কয়েক বছর ধরেই উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক কারবারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ড চলে আসছে। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার একর বিস্তৃত এলাকাজুড়ে রোহিঙ্গাদের বসবাস। স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকটি সূত্র জানায়, ক্যাম্পের ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক গ্রুপ। বিশেষ করে কুতুপালং, রেজিস্ট্রাট ও রোহিঙ্গাতালে রোহিঙ্গা অপরাধীদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। আধিপত্য, অপহরণ, ধর্ষণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে প্রায়ই গ্রুপগুলোর মধ্যে মারামারি ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে মাস্টার রফিক, মৌলভী ইউনুছ, আনাস, আরসা ও মুন্না গ্রুপের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। তাদের সঙ্গে মিয়ানমারে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে। বিশেষ করে তাদের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আসে ক্যাম্পে। তাছাড়া তাদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু লোকের সম্পর্ক আছে। তাদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা নানান অপরাধ কর্মকান্ড চালায়। প্রতিটি ক্যাম্পেই রোহিঙ্গাদের আনাগোনা বেড়েছে। বিভিন্ন এনজিওর তৎপর আছে। ব্র্যাক, কষ্ট, মুক্তি, ইউনিসেফ, ডিআরসি, ইউনিসিআর, থাই, এমএসএফসহ অন্তত অর্ধশত এনজিও রোহিঙ্গাদের উন্নয়নে কাজ করছে। এনজিওকর্মীরা রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষদের নানা উপদেশ বা পরামর্শ দিচ্ছেন। শিক্ষালয়ে শিশুদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। তবে বাংলা ভাষায় কাউকে পড়ানো হচ্ছে না। বার্মা ও ইংরেজি ভাষায় শিশুদের পাঠদান করানো হচ্ছে। তাছাড়া জন্ম বিরতিতে উপকরণ ব্যবহারে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ঘন ঘন সন্তান না নিতে নারীদের বলা হচ্ছে। যৌন মিলনে লিপ্ত হলে কনডম ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন নাগরিক বাংলাদেশে আসছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। তবে তাদের প্রতিরোধ করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে অনেক রোহিঙ্গা অপরাধীর আনাগোনা রয়েছে। নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত রোহিঙ্গা অপরাধীদের তালিকা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তালিকার কাজ শুরু হয়েছে। ওই দুই কর্মকর্তা আরও বলেন, সম্প্রতি ক্যাম্পের ভেতরে হত্যাকান্ডসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন। এই নিয়ে মন্ত্রণালয়সহ আমরা একাধিক বৈঠক করেছি। র‌্যাব ও বিজিবি আলাদাভাবে বৈঠক করেছে। ওইসব বৈঠকে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা অপরাধীদের ধরতে ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। রোহিঙ্গারা এলাকার পরিবেশ নষ্ট করবে তা হতে দেওয়া হবে না। বর্তমানে এপিবিএন ক্যাম্পের ভেতরে সক্রিয় আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত