সামাজিক অসংগতি রোধে সংস্কৃতিচর্চা

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৪:০৯ এএম

সংস্কৃতি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংস্কৃতির মূল উদ্দেশ্য সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টা। সংস্কৃতির অর্থই হচ্ছে সংস্কার বা বিশুদ্ধিকরণ। সমাজের সব অসত্য, অন্যায়-অনাচার ও কুসংস্কার দূর করে সত্য ও সুন্দরের চর্চা করাই সংস্কৃতির প্রধান কাজ। তাই সমাজজীবনে সংস্কৃতির গুরুত্ব অত্যধিক। কিন্তু আমাদের দেশে সংস্কৃতি মানেই যেন ভিনদেশি সংস্কৃতি ও সেদেশীয় বিনোদনের অন্ধ অনুকরণ।

সংস্কৃতি হলো মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে টিকে থাকার কৌশল। যা নির্ভর করে ভৌগোলিক, ধর্মীয়, সামাজিক ও জৈবিকসহ নানা বৈশিষ্ট্যের ওপর। মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা।’

সংস্কৃতির অন্যতম উৎস ধর্ম। তাই ধর্মকে পাশ কাটিয়ে সংস্কৃতির কল্পনা করা যায় না। ধর্মকে বাদ দিয়ে সংস্কৃতিকে বরণ করা মানে নিজেদের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া, যা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। অবশ্য ওপরে যেসব সংস্কৃতির কথা বলা হয়েছে তা যদি অন্য কোনো ধর্মের হয়ে থাকে, আর সে ধর্মের অনুসারীরা যদি তা উদযাপন করতে চায় তো তাদের সে সুযোগ রয়েছে। তাতে বাধা দেওয়ার অধিকার ইসলাম কাউকে দেয়নি। ইসলাম বলে- ‘তাদের কর্ম ও কর্মফল তাদের জন্য এবং আমাদের কর্ম ও কর্মফল আমাদের জন্য।’ (সুরা কাফিরুন, আয়াত : ০৬)। কিন্তু এসব উৎসবে অংশগ্রহণ জায়েজ নেই। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্য কোনো সম্প্রদায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখল, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৫১৪)

বিনোদনের নামে অপসংস্কৃতিতে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশ। বিনোদনের অজুহাতে নগ্নতার নেশায় আচ্ছন্ন তরুণ প্রজন্ম। বাদ নেই আবালবৃদ্ধবনিতাও। আর এর মূলে রয়েছে আকাশ সংস্কৃতির সহজলভ্যতা। বিশেষত প্রতিবেশী দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর প্রভাবে ভাঙছে আমাদের সমাজসভ্যতা ও পারিবারিক বন্ধন। মনে রাখা প্রয়োজন, বিনোদন সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। সুস্থ বিনোদন সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসনীয়।

মানবতার ধর্ম ইসলামও সুস্থ বিনোদনকে সমর্থন ও উৎসাহ প্রদান করে। অনেকেই মনে করেন, ইসলামে বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই। ইসলামের গ-িতে থাকা মানেই রসহীন জীবনযাপন করা। তাই চিত্তবিনোদনের জন্য ইসলামের আবরণ সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। জ্ঞানের সংকীর্ণতার কারণে হয়তো কেউ কেউ এমন মনে করতে পারেন।

অভিধানে বিনোদন বলা হয়, দীর্ঘক্ষণ কাজ করার পর বিষাদ-ক্লান্তিতে অথবা অবসরে মনে একটু আনন্দ জোগানো। ব্যক্তির কাজের গতিকে অটুট রাখতে বিনোদন যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। বিনোদন না থাকলে কাজের উদ্যম হারিয়ে যায়। তাই শিক্ষণীয় ও নৈতিকতাঋদ্ধ বিনোদনকে ইসলাম কখনোই নিষেধ করে না। শিক্ষণীয় বিনোদনের জন্য রাসুল (সা.) সাহাবিদের উৎসাহ দিতেন। তাদের থেকে কোরআন তেলাওয়াত, কবিতা ও বক্তৃতা শুনতেন। শরীরচর্চার তাগিদ দিতেন। শিক্ষণীয় ও নৈতিক বিনোদনের জন্য ভ্রমণ অত্যন্ত ফলপ্রসূ। আল্লাহতায়ালা ভ্রমণ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো, কীভাবে তিনি সৃষ্টি কর্ম শুরু করেছেন।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ২০)

তবে এ কথা সত্য যে, তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিকে রোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু কুশিক্ষা ও অপসংস্কৃতির প্রতিরোধ সম্ভব। বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞানীদের অন্যতম বিস্ময়কর অবদান হচ্ছে আকাশ-সংস্কৃতি। এ আকাশ-সংস্কৃতির যেমন অপকারের শেষ নেই। তেমনি এর অবদানকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। সুতরাং অন্যের কাছে কেন আমরা আমাদের শিক্ষা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও নৈতিকতা পৌঁছে দিতে পারব না?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত