অবৈধ মাদক নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২০, ০৭:২৫ এএম

অবৈধভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কথিত মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড ‘মানসিক’ হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে হাসপাতালটির কর্মচারীদের মারধরে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিমের মৃত্যুর পর উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতেই শুরু হয়েছে এ অভিযান। এর অংশ হিসেবে গত তিন দিনে শুধু রাজধানীতেই তিনটি কথিত মাদক নিরাময় কেন্দ্র সিলগালা করে দিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

যেসব প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে মিরপুরের হলিলাইফ, উত্তরার লুবনা ও বাড্ডার শান্তিনিবাস। পর্যায়ক্রমে দেশের সব অবৈধ মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে অনুমোদিত মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে সঠিকভাবে  চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য ওইসব প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চলবে বলে ডিএনসি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে তেজগাঁও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়। কেন্দ্রীয় এ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে বর্তমানে ১০০ শয্যা আছে। তার মধ্যে শিশুদের জন্য ১০ শয্যা। ৬৫ শয্যায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখানে তিন ও পাঁচতলার দুটি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে তিনতলা ভবনের দুটি তলায় রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শয্যা দ্বিগুণ হলেও জনবল বাড়েনি। বর্তমানে আটজন নার্স দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নার্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকাসক্ত রোগীরা অন্য রোগীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন। চিকিৎসা চলাকালে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে রোগীরা। ২৪ ঘণ্টাই এসব রোগীকে চিকিৎসার মধ্যে রাখা হয়।

তারা আরও জানান, উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধের পাশাপাশি সাইকোসোশ্যাল, সাইকোরিলিজিয়াস পদ্ধতিতে পরামর্শ, কাউন্সেলিং ও থেরাপিসহ রোগীদের বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনমূলক কার্যক্রমও রয়েছে। এছাড়াও রোগীদের সুস্থ করে তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে জনবল একেবারেই কম।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, সরকারি মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের অপ্রতুলতার সুযোগে নিয়মনীতি না মেনেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের যেখানে সেখানে কথিত মাদক নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। আর সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন তা যেন দেখেও না দেখার ভান করছে। বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশে এ ধরনের কমপক্ষে ১ হাজার ২০০ অবৈধ মাদক নিরাময় কেন্দ্র আছে বলে জানা গেছে। আর অনুমোদিত মাদক নিরাময় কেন্দ্র আছে মাত্র ৩১২টি। তার মধ্যে ঢাকায় আছে ১০৫টি।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধ মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসার নামে চলছে রোগী ও তার স্বজনদের পকেট কাটা। আর শুধু তাই নয়, সেখানে রোগীদের ওপর চালানো হচ্ছে বিভিন্ন কায়দায় নির্যাতন। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতি না থাকলেও সেখানে অবাধ যাতায়াত সন্ত্রাসীদের। অনেকে আবার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র করে সেখানে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ চালিয়ে আসছে। রাজনৈতিক প্রভাব থাকার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করার সাহসও পায় না। আর একই কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও সেখানে অভিযান চালাতে অনীহা দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আহসান জাবের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা মাইন্ড এইড মানসিক ও মাদকাসক্তি নিরাময় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করেছি। এ ধরনের অবৈধ বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ করা হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এতদিন সবাই নীরব ছিল। পুলিশ কর্মকর্তার অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনায় আমাদের সবার টনক নড়েছে। এখন অনেক অভিযোগই সামনে আসছে। যেগুলো অ্যাড্রেস করা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেও ছদ্মবেশে রোগী সেজে একটি আলোচিত নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সেখানে চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। আমরা নিয়মিত পরিদর্শন আগেও করতাম। এখন জোরদার করেছি। বৈধ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অবৈধগুলোকেও শনাক্ত করা হচ্ছে। যেগুলোর লাইসেন্স নেই সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’

আদাবরের আলোচিত মাইন্ড এইড হাসপাতাল মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অনুমোদন নেওয়ার পর মানসিক চিকিৎসালয় হিসেবে সাইনবোর্ড ঝোলায় জানিয়ে ডিএনসি মহাপরিচালক বলেন, ‘এটা দেখার দায়িত্ব ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের। কারণ মাদক নিরাময় চিকিৎসার লাইসেন্স দেয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আর মানসিক চিকিৎসার লাইসেন্স দেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। কাজেই আদাবরের প্রতিষ্ঠানটির দেখভাল করার দায়িত্বটাও স্বাস্থ্যেরই।’

মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির পর মাদকাসক্ত রোগীদের মাদকদ্রব্য সেবন করতে দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। আমাদের জানামতে এ ধরনের রোগীদের প্রাথমিকভাবে মেথাডল নামে একটা মেডিসিন দেওয়া হয়। যাতে ধীরে ধীরে তার মাদকাসক্তি কমে যায়। আর খুনখারাবি ও অসামাজিক কার্যকলাপসহ অন্যান্য অভিযোগ উঠলে সেটা দেখার দায়িত্ব পুলিশের, মাদক বিভাগের নয়। আমরা শুধু পরিদর্শন করে রিপোর্ট দিতে পারি।’

বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের অনিয়ম আর সরকারি কেন্দ্রগুলোর জনবল সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রায়ই অভিযোগ আসে বেশিরভাগ নিরাময় কেন্দ্রে তালা মেরে রাখা হয় মাদকাসক্ত রোগীদের। রোগীদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের সদস্যরা ওইসব চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকেন সার্বক্ষণিক। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালে সরকারি মাদকাসক্ত কেন্দ্র থাকলেও জনবল নেই বললেই চলে। আর এ কারণে সরকারি কেন্দ্রগুলোতেও রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না তা সত্য। ওইসব স্থানে জনবল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাস্তার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে শত শত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র। সরকারিভাবে অনুমোদন না নিয়ে এসব ব্যবসা চালানো হচ্ছে। নামে-বেনামে গড়ে ওঠা এসব কেন্দ্রে চিকিৎসার কোনো বালাই নেই। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে অসাধু চক্র ব্যবসা চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত