দেশে চার দফা বন্যায় আউশ ও আমনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে আমনের ক্ষতি বেশি হওয়ায় চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় দেশে চালের চাহিদা পূরণে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করেছে সরকার। এছাড়া আগামী আউশ ও আমন মৌসুমেও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বোরো মৌসুমে যদি বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না আসে তাহলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেই চালের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে। এছাড়া লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও আগের মৌসুমের চেয়ে অনেক বেশি আমন চাল উৎপাদন হতে যাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ গত সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের বন্যায় আমাদের ৫৪ হাজার হেক্টর জমির আমন নষ্ট হয়েছে। আমাদের আশঙ্কা এতে হয়তো সর্বোচ্চ ২ লাখ টন চাল কম উৎপাদিত হবে। তবে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা কিন্তু আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এছাড়া আউশের আবাদও বেশ ভালো হয়েছে। তাই আমনের ক্ষতি তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না।’
তিনি আরও বলেন, এবার আমরা সবকিছু মাথায় রেখে বোরোর লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছি। গত বছর ৯ লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড বোরো আবাদ হয়েছিল। এবার ২ লাখ হেক্টর জমি বাড়ানো হয়েছে। এতে অন্তত ২ লাখ টন চাল বেশি হবে বলে আমরা আশা করছি। তাই আমরা বলতে পারি, বাজারে কোনোভাবেই চালের সংকট পড়বে না। বরং বাড়তি থাকতে পারে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আমরা সার, বিজসহ বিভিন্ন কৃষি সরঞ্জামের মাধ্যমে প্রণোদনা দিচ্ছি।’
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট উৎপাদিত চালের অর্ধেকেরও বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে। এছাড়া চিকন জাতের চালের মূল মৌসুম হলো বোরো। প্রতি বছর চিকন চালের চাহিদা বাড়ছে। এজন্য বোরোর ওপর চাপ বেশি পড়ছে। অধিদপ্তরও প্রতি বছর এ মৌসুমে চাল উৎপাদন বাড়িয়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে ১১ লাখ ৪ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে ৫৪ লাখ ৫৭ হাজার ৭০০ টন হাউব্রিড বোরো, ৩৬ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৫০ লাখ ২১ হাজার ৭০০ টন উফসি বোরো এবং ২৬ হাজার ৭৩৭ হেক্টর জমিতে ৫২ হাজার টন দেশি জাতের বোরো উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অধিদপ্তর থেকে আরও জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে মোট চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৩৮ লাখ ৬ হাজার ৭০০ টন, এর মধ্যে বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয় ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার ১০০ টন। এর মধ্যে বোরো ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮০০ টন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৫ লাখ টন বেশি। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট চাল উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৭৩ লাখ টন। এর মধ্যে বোরো ২ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৮ লাখ টনেরও বেশি। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মোট ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৬ হাজার ৩৪০ টন চাল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ১ কোটি ৪০ লাখ ৫ হাজার ৪৯০ টন আমন, ২ কোটি ৩ লাখ ৮ হাজার ৮৫০ টন বোরো ও ১৯ লাখ ২০ হাজার টন আউশ।
এদিকে বন্যায় আমনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, গত আউশ ও চলতি আমন মৌসুমে আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশেষ করে আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৪ লাখ টন বেশি। এছাড়া আউশের উৎপাদনও আগের বছরের চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে। অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৩৯ দশমিক ৯৩ লাখ টন আমন চাল উৎপাদন হয়েছিল। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪০ দশমিক ৫৪ লাখ টনে। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমন উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৪২ লাখ টন। কিন্তু এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫৫ দশমিক ৯০ লাখ টন। তাই বন্যায় যদি ৪-৫ লাখ টন চাল কম উৎপাদিত হয় তাতেও আগের বছরের তুলনায় বাড়তি উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে আবার বোরোর বাড়তি উৎপাদন বাজারে চালের সংকট দূর করতে সহায়তা করবে।
দেশে বার্ষিক চালের চাহিদা কত তার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। তবে ধারণা করা হয়, এর পরিমাণ ৩ কোটি টনেরও বেশি হবে। এছাড়া মোটা জাতের কিছু চাল বিভিন্ন প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চালের সঠিক চাহিদা নির্ধারণ করতে না পারার অন্যতম কারণ জনসংখ্যার সঠিক হিসেবে গরমিল থাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৭৬ লাখ। এছাড়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা ও কয়েক লাখ বৈধ-অবৈধ বিদেশি বাংলাদেশে অবস্থান করছে। চালকল মালিকরা দাবি করছেন, চালের উৎপাদনের হিসাব কষলে দেশে প্রকৃতপক্ষে ১৯-২০ কোটি মানুষ বসবাস করে।
