কার ভুলে ভাতাবঞ্চিত ৪ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০২:১৪ এএম

স্ক্যানিং থেকে নাম কাটা যাওয়ায় ওয়েবসাইটেও নাম নেই ঢাকা মহানগরের অন্ততপক্ষে ২১ জনের বেশি বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম। আর ওয়েবসাইটে নাম না থাকার কারণে এ বছরের জুলাই থেকে তারা ভাতাও পাচ্ছেন না। শুধু স্ক্যানিংয়ের কারণেই নয়, সর্বশেষ লাল মুক্তিবার্তার ওয়েবসাইটে তালিকার ক্রমেও রয়েছে অসংগতি। এই অসংগতির কারণে প্রায় চার শতাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চার মাস ধরে। তারা অনেকেই অভিযোগ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা শাখায় যোগাযোগ করলেও কেউ কানে তুলছে না। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এই মুক্তিযোদ্ধারা। প্রায় প্রতিদিনই এর বাইরে শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে এলেও দিনের পর দিন তাদের বসে থাকতে হয়।

তালিকার ৪২ নম্বর পৃষ্ঠায় স্ক্যানিং থেকে কাটা যাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, এই যে এত দিন ধরে শুধু ফটোকপি ও ক্রমের ভুলের কারণে শত শত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন না, এ ব্যাপারে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এখানে এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন যাদের সংসার চলে এই ভাতার টাকা দিয়ে। আবার অনেকেই আছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ও তাদের এই ভাতার ব্যাপারে উদাসীনতায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে যদি তারা মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজে যান তাহলে ন্যূনতম শ্রদ্ধাও করা হয় না। খুব অবহেলা করা হয়। এটা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বেশি। আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সব ব্যবস্থা রয়েছে।

এসব মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সরকার কিসের ভিত্তিতে তাদের নাম ফেলে দিয়েছে, সেটিও তারা জানেন না। আবার অনেকেই হতাশায় রয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তাদের সন্তানসন্ততিরা সুবিধাগুলো পাবে কি না। তারা মারা গেলে তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে কি না। এই সব জল্পনা-কল্পনা নিয়ে তাদের সময় কাটছে। তারা এ ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান।

মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই এটা ঠিক করা হবে। যাদের নাম বাদ পড়েছে এবং ভাতা যাচ্ছে না, তাদের সমাজসেবায় যোগাযোগ করে নাম হালনাগাদ করার অনুরোধ জানান তিনি। এরপরও যদি কোনো ঝামেলা হয়, তাহলে মুক্তিযোদ্ধারা যদি সরাসরি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন অবশ্যই এটি ঠিক করে দেওয়া হবে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি বিস্মিত হয়েছি। তারা কতটা উদাসীন হলে স্ক্যানিংয়ের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা কাটা পড়ে যাবে। এত বছর হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি। মুক্তিযোদ্ধারা এখন অনেকেই মারা যাচ্ছেন। তারা তাদের জীবদ্দশায় একটি পূর্ণ তালিকা দেখে যেতে পারেননি। দ্রুত ওয়েবসাইটের এই তালিকা সংশোধনের দাবি জানাচ্ছি। এখনই যদি তালিকা সঠিক না হয়, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম কাজ  করবে কীভাবে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সর্বশেষ প্রকাশিত লাল মুক্তিবার্তায় (লাল বই) ঢাকা মহানগরের তালিকায় দেখা যায়, মূল কপি থেকে স্ক্যানিং করার সময় অনেক নাম কাটা পড়েছে। এই সমস্যার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ২১ জন মুক্তিযোদ্ধা। এ ছাড়া তালিকায় ক্রমধারার কোনো মিল নেই। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার তালিকায় ০১০১১১০০৫৬ নম্বর ক্রমধারায় মো. শাহ আলম ভূঁইয়ার নাম রয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে পরের নম্বরটির শেষ দুই সংখ্যা ০০৫৭ থাকার কথা। কিন্তু ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকায় ০১০১১১০০৫৭-০১০১১১০০৬২ নম্বর পর্যন্ত উল্লেখ নেই। ঠিক কী কারণে ওই নামগুলো বাদ পড়েছে, সে বিষয়েও তালিকায় বা ওয়েবসাইটে স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ নেই। কেবলমাত্র এই কারণে বাদ পড়েছে প্রায় চার শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার নাম। এর মধ্যে ধানম-িতে ৪০, সূত্রাপুরে ৫০, মিরপুরে ৮, তেজগাঁওয়ে ১, লালবাগে ২৯,  ডেমরায় ৩৭, মতিঝিলে ৩৬, পল্লবীতে ১২, কোতোয়ালিতে ২৯, সবুজবাগে ৫০, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ২০, উত্তরায় ২১, গুলশানে ১৮, মোহাম্মদপুরে ৪৫ ও রমনায় ৪ জন।

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এখন পর্যন্ত সাতবার হালনাগাদ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জনের তালিকার গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আগের তালিকায় ৭০ হাজারের বেশি অমুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন বলে দাবি করে। এর পরপরই তারা তালিকা হালনাগাদের উদ্যোগ নেয়। স্বচ্ছ তালিকা প্রণয়ন করতে জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আরও সাড়ে ১১ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে সনদ দেয় সরকার। কিন্তু ৭০ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন বলে যে দাবি করা হয়েছিল তাদের সনদ বাতিল করা হয়নি। উল্টো সেই সময়ে যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ২০১৪ সালে ভুয়া প্রমাণিত হন। তাদের মধ্যে ছয়জন সচিবও রয়েছেন। তবে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলতে থাকে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৬৬তম সভায় নতুন প্রায় ১ হাজার ৩০০ মুক্তিযোদ্ধার নামের একটি তালিকা অনুমোদন করা হয়। গেজেট প্রকাশের আগে যারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি, তাদের নাম বাদ দিয়ে ১ হাজার ২৫৬ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়। পর্যায়ক্রমে আরও নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয় সূত্র।

২০১৪ সালে জনপ্রশাসনের ছয় সচিব, শীর্ষ কর্মকর্তাসহ প্রায় তিন হাজার ব্যক্তির ভুয়া সনদ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। যাদের অধিকাংশ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের হালনাগাদ তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। তারা সবাই স্বেচ্ছায় অবসরে যান। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেওয়ার অভিযোগ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধেও। এ ব্যাপারে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। কিন্তু গত ছয় বছরে কোনো মামলা হয়নি। এ ছাড়া চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেননি, অথচ পরে সনদ নিয়েছেন, এমন অভিযোগ পাওয়া যায় এক সচিবসহ ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর আগে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ‘একাত্তরের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা প্রকাশ—প্রথম পর্ব’ শিরোনামে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে সারা দেশে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও সমালোচনার মুখে ওই তালিকা স্থগিত করা হয়।

গতকাল সরেজমিন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা তালিকায় তাদের নাম ওঠা এবং বিভিন্ন স্থানে তাদের জমিদখলসহ অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে এসেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত