চলে গেলেন দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও কলামনিস্ট খন্দকার মুনীরুজ্জামান (৭৩)। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মুনীরুজ্জামান করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত তিন সপ্তাহ ধরে ওই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনি স্ত্রী ও এক ছেলে রেখে গেছেন।
তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক জানিয়েছেন। এছাড়াও বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সম্পাদক পরিষদসহ বিভিন্ন সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠন তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ তার শোকবার্তায় বলেন, ‘মুনীরুজ্জামান ছিলেন নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভীক সাংবাদিকতার পথিকৃৎ। তার মৃত্যু গণমাধ্যমের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। ’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
গত ৩১ অক্টোবর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর দুই সপ্তাহ আইসিইউতে রাখতে হয়েছিল মুনীরুজ্জামানকে। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় কয়েক দিন আগে আইসিইউ থেকে তাকে কেবিনে নেওয়া হয়েছিল।
মুনীরুজ্জামানের প্রথম জানাজা মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। বিকাল ৪টায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, খন্দকার মুনীরুজ্জামান ছিলেন বিরল প্রতিভার অধিকারী। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে তিনি ছিলেন আপসহীন। তার ক্ষুরধার লেখনি পাঠক হৃদয়ে জাগরূক হয়ে থাকবে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন আমার অতি আপনজন।
বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশ ও রক্ষায় এবং গণমাধ্যমকে গণমানুষের দর্পণে পরিণত করতে মুনীরুজ্জামানের অবদান অনস্বীকার্য। তার মৃত্যুতে জাতি একজন প্রথিতযশা সাংবাদিককে হারাল।
জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, ‘নির্ভীক ও আদর্শবান সাংবাদিকতার প্রতীক ছিলেন মুনীরুজ্জামান। গণমাধ্যমকর্মীদের দক্ষতা, উন্নয়ন এবং স্বার্থ সংরক্ষণে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে গণমাধ্যমের যে ক্ষতি হয়েছে, তা সহসাই পূরণ হওয়ার নয়।’
দৈনিক সংবাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কাশেম হুমায়ুন তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘মুনীর ভাই করোনা থেকে সেরে উঠেছিলেন। তবে করোনাপরবর্তী নানা জটিলতায় তিনি মারা যান।’
সম্পাদক পরিষদের শোক : সাংবাদিক খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মৃত্যুতে শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। সংগঠনের সভাপতি মাহফুজ আনাম ও সাধারণ সম্পাদক নঈম নিজাম এক শোকবার্তায় বলেন, সম্পাদক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত গণমাধ্যম বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার মৃত্যুতে জাতি একজন প্রথিতযশা সাংবাদিককে হারাল।
এছাড়া মুনীরুজ্জামানের মৃত্যুতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল হক শোক প্রকাশ করেছেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতারা পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন।
খন্দকার মুনীরুজ্জামান ১৯৪৮ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতায় তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। একই সময়ে তিনি বাম রাজনীতির দীক্ষা নেন। সাংবাদিক হিসেবে মুনীরুজ্জামান বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। দৈনিক সংবাদে তিনি একসময় সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। তিনি দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন। খন্দকার মুনীরুজ্জামান কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, চিত্র সমালোচনা এবং নিয়মিত কলাম লিখতেন।
