আমার জীবনের বড় দুঃখের ঘটনা হলো ম্যারাডোনাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখিনি। ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে আমি দুবার বিশ^কাপ ফুটবল কাভার করতে গিয়েছি। এর মধ্যে ২০০৬ ও ২০১৪ সালে আমি মাঠে বসে বিশ্বকাপ কাভার করেছি। ২০০৬ সালের বিশ^কাপের সময় একটা ম্যাচে ম্যারাডোনা গ্যালারিতে এসেছিলেন। সম্ভবত সেটা আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডস ম্যাচ ছিল। ম্যারাডোনা গ্যালারিতে আসার পরই পুরো গ্যালারিজুড়ে একটা আলোড়ন তৈরি হয়। ম্যারাডোনা আসার পর গ্যালারি যেভাবে জেগে উঠেছিল, এটা শুধু ম্যারাডোনা এলেই সম্ভব। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখেছিলাম। ম্যারাডোনা যেখানে বসেছিলেন, আমি সেখানে যাওয়ার খুব চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু নিরাপত্তার লোকজন আমাকে সেখানে যেতে দেননি। সেটা আমার ভীষণ দুঃখের ঘটনা। আমি যদি ২০১০ সালের বিশ্বকাপ কাভার করতে যেতাম, তাহলে হয়তো কাছ থেকে দেখতে পারতাম। ১৯৯৪ সালে যারা মাঠে বসে বিশ্বকাপ কাভার করতে পেরেছেন, তারা কাছ থেকে ম্যারাডোনাকে দেখতে পেরেছেন। যারা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ কাভার করার সুযোগ পাননি, তাদের জন্য সুযোগ হয়ে এসেছিল ২০১০ সালের বিশ্বকাপ। ম্যারাডোনা তখন আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে মাঠে ছিলেন। তখন অনেকেই কাছ থেকে দেখেছেন। আমি খুব কাছ থেকে দেখতে পারিনি। কিন্তু ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের সময় ম্যারাডোনা মাঠে আসার পর দর্শকের উন্মাদনা দেখেছি। পুরো মাঠ ম্যারাডোনার জন্য একসঙ্গে জেগে উঠতে দেখেছি। ২০১০ সালের বিশ^কাপ কাভার করতে না যাওয়ার দুঃখবোধ আমার থেকে যাবে। কারণ শুধু ফুটবলের সীমানায় নয়, পুরো ক্রীড়াঙ্গনে ম্যারাডোনার মতো এমন বর্ণময় চরিত্র আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই আমি মনে করি, ম্যারাডোনাকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা একজন ক্রীড়া সাংবাদিকের জন্য সারা জীবনে গর্ব করার মতো একটা ঘটনা। যেটা আমার নেই। এটা আমার জন্য ভীষণ দুঃখবোধের।
ম্যারাডোনা আসলে কী ছিলেন, সেটা এককথায় ব্যাখ্যা করা খুবই মুশকিল। তার মৃত্যুর পর পুরো পৃথিবীজুড়ে যা হচ্ছে, সেটা দেখেই বোঝা যায় ম্যারাডোনা আসলে কী ছিলেন! ম্যারাডোনা সবশেষ বিশ^কাপ খেলেছেন ১৯৯৪ সালে। আজ থেকে ২৬ বছর আগে। অথচ এখন যে কিশোরের বয়স ১৫ বছর, সেও ম্যারাডোনাকে ভালোবাসে। গৃহিণী, কিশোর-কিশোরীসহ সব বয়সী মানুষের কাছে ম্যারাডোনা প্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন নানা কারণে। খেলা এবং খেলার বাইরের জীবন দিয়ে ম্যারাডোনা সবার কাছে আলোচিত হয়েছেন। তার মৃত্যুর খবরটি শোনার পর সব বয়সী মানুষই কিন্তু বেদনাহত হয়েছেন। যারা ম্যারাডোনার খেলা দেখেননি, যারা খেলা দেখেছেন সবাই কিন্তু মর্মাহত হয়েছেন। এটা তখনই হয়, যখন একজন মানুষ নানাভাবে মানুষের মধ্যে বিচরণ করে। ম্যারাডোনা দোষে-গুণে মিলে একজন মানুষ ছিলেন। তিনি ফুটবল মাঠে যেমন আলোচিত হয়েছেন, আবার ফুটবল মাঠের বাইরে ব্যক্তিজীবনেও আলোচিত হয়েছেন। ফুটবল মাঠে তার অসামান্য সব কীর্তি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বিশ^বাসী, কখনো কখনো তাকে মনে হয়েছে অতিমানব। আবার মাঠের বাইরে নানা ঘটনার জন্ম দিয়েছেন। সেটা মাদকাসক্তির জন্য কিংবা অকারণে ঝামেলায় জড়িয়ে তিনি আলোচিত হয়েছেন। তার বাসার সামনে ভিড় করার কারণে তিনি একবার সাংবাদিকদের এয়ারগান দিয়ে গুলি করেছিলেন। আবার এই ম্যারাডোনা ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে বন্ধুত্ব, বাহুতে চে গুয়েভারার উল্কি আঁকার মতো ঘটনায় অনেকের কাছে শ্রদ্ধার আসনে বসেছেন। যখনই কোনো অন্যায় দেখেছেন, তার কাছে মনে হয়েছে এটা অন্যায়। তখন তিনি সেটা প্রতিবাদ করেছেন। তার মধ্যে একটা বিদ্রোহী সত্তা ছিল। তার এই দোষ-গুণের কারণে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তাকে ভালোবাসত। সবকিছু মিলিয়ে ম্যারাডোনা এমন একটা আইকন, তার কাছাকাছি মানের ফুটবলার হয়তো আসবে। কিন্তু আলোচনায় ম্যারাডোনাকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না। পেলে বড় খেলোয়াড় নাকি ম্যারাডোনা বড় খেলোয়াড়? এই তর্ক হয়তো আরও অনেক দিন চলবে। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে, খেলোয়াড় এবং মানুষ ম্যারাডোনা মাঠে ও মাঠের বাইরে তার কর্মকা- মিলিয়ে দ্বিতীয় ম্যারাডোনা আর পৃথিবীতে আসবে না। ফুটবল মাঠে খেলার ম্যাজিক অনেক খেলোয়াড়ই হয়তো দেখাবেন। কিন্তু ম্যারোডোনা একজনই এবং এর কোনো বিকল্প হবে না।
লেখক : জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক
শ্রুতিলিখন : পাভেল রহমান
