ব্র্যাক জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ (ব্র্যাক জেপিজিএসপিএইচ), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি তরুণ পুরুষদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) এর উপর করা গবেষণা, “বাংলাদেশের তরুণ পুরুষদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকারঃ একটি মিশ্র পদ্ধতির জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা” হতে প্রাপ্ত ফলাফল উপস্থাপনের জন্য “বাংলাদেশে তরুণ পুরুষদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (এসআরএইচআর) প্রচার:চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ” শীর্ষক একটি ওয়েবিনার আয়োজন করে।
এই গবেষণাটি রয়্যাল কিংডম অফ নেদারল্যান্ডস এম্ব্যাসি কর্তৃক অর্থায়নকৃত।
এই ওয়েবিনারে ব্র্যাক জেপিজিএসপিএইচ এর ডিন এবং প্রফেসর সাবিনা ফায়েজ রশিদ, গবেষণা সমন্বয়কারী ফারজানা মিশা এবং জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো সুবাস বিশ্বাস গবেষণালব্ধ প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করেন।
এরপরে পর্যায়ক্রমে ড. মোহাম্মদ জয়নাল হক (প্রোগ্রাম ম্যানেজার, কিশোর এবং প্রজনন স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর), সৈয়দ মাহফুজ আলি (সিনিয়ার স্পেশালিস্ট, কারিকুলাম বিভাগ, এনসিটিবি) এবং ড. বেলাল হোসেন (প্রফেসর, পপুলেশান সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ওয়েবিনারটির আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণ করেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ জনস্বাস্থ্য উপদেষ্টা ড. আবু জামিল ফয়সাল বিশেষ অথিতি হিসেবে এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহান আরা বানু (এনডিসি) প্রধান অতিথি হিসেবে ওয়েবিনারে যোগদান করেন।
অধিবেশনে অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা, প্রখ্যাত উন্নয়ন সংস্থাসমূহের কর্মী, মাঠ পর্যায়ের উন্নয়নকর্মী এবং সাংবাদিকগণ যোগদান করেন।
ব্র্যাক জেপিজিএসপিএইচ তরুণ পুরুষদের জন্যে স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা, উৎস, এসআরএইচআর কার্যক্রম, এবং জাতীয় এসআরএইচআর নীতি এবং আইন এর উপর প্রাপ্ত প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করে। গবেষণালব্ধ ফল অনুযায়ী তরুণদের যৌন এবং প্রজনন সংক্রান্ত স্বাস্থ্যসেবার গ্রহণের হার সুবিধা অপ্রাপ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিতে তরুণদের অনিচ্ছার কারণে বেশ কম।
এছাড়াও, পাঠ্যপুস্তকসমূহ নারীদের এসআরএইচআর এর তুলনায় তরুণদের এসআরএইচ বিষয়ক বিষদ আলোচনার জন্যে যথোপযুক্তভাবে পরিকল্পিত না। উদাহরণস্বরূপ, পাঠ্যপুস্তকে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যাবলি থাকলেও এক্ষেত্রে পুরুষ বিষয়ক আলোচনার অন্তর্ভুক্তি কম। জাতীয় নীতিসমূহ এবং উন্নয়ন নির্ধারক সূচকসমূহ নারী এসআরএইচআর উন্নয়নকেন্দ্রিক। তরুণ পুরুষদের এসআরএইচআর বিষয়ক বর্তমান আইন, বিশেষ করে পিনাল কোডের ৩৭৫ ধারা পুরুষকে ধর্ষণের ভুক্তভোগী হিসেবে স্বীকার করে না।
ড. জয়নাল হক তাঁর বক্তব্যে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা এবং বিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় স্থাপনের মাধ্যমে তথ্য, পরামর্শ এবং সেবা সংক্রান্ত সাহায্য আদান- প্রদানের উপর গুরুত্ব দেন। তিনি সরকারের “leave no one behind (কাউকে বাদ দিয়ে নয়)” লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করেন।
সৈয়দ মাহফুজ আলি নেতিবাচক পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব, লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা, “গ্যাং কালচার” ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে ছেলেদের জন্যে পাঠ্যপুস্তকে এসআরএইচআর শিক্ষাক্রম উন্নয়ন নিয়ে তাঁর মনোভাব প্রকাশ করেন এবং নারীদের মতো পুরুষদের জন্যেও পাঠ্যপুস্তকের বিষয়াবলি নির্ধারণের কথা বলেন।
তিনি কিশোরদের এবং তরুণ পুরুষদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্যে সেসবের উপর তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে এনসিটিবি শিক্ষাক্রম পুনর্বিবেচনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং এসআরএইচআর সংক্রান্ত বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্তি নিয়ে পরামর্শ দেয়ার ব্যাপারে ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহিত করেছেন।
তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন যে পুরুষদের এসআরএইচআর এর উন্নয়ন ব্যতীত নারীদের এসআরএইচআর এ সর্বাধিক উন্নয়ন অর্জন করা অসম্ভব।
তিনি “জেনারেশন ব্রেকথ্রু” (কিশোরদের জন্য একটি এসআরএইচআর কার্যক্রম) এর সাফল্যের কথা উল্লেখ করে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার একযোগে কাজ করার ইতিবাচক দিকের উপর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
প্রফেসর ড. বেলাল সমাজ, বিশেষ করে পিতা-মাতা এবং সমাজের নেতাদের এসআরএইচআর বিষয়ে সংবেদনশীল করার ক্ষেত্রে দেশের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কৌশল অবলম্বনের গুরুত্বের কথা বলেন।
তিনি বয়সভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রবর্তনের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করে এসআরএইচআর সম্পর্কিত সমস্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি আরো বলেন, তরুণ পুরুষদের এসআরএইচআর এ সাফল্য অর্জন করতে হলে সর্বস্তরের সংগঠনের প্রায়োগিক যোগ্যতা অর্জন করতে হবে ।
ড. আবু জামিল ফয়সাল সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে এসআরএইচআর কার্যক্রমে তাঁর দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন যে মাতাপিতা এবং সমাজের মানুষজন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ট্যাবুর কারণে এখনো এসআরএইচআর সংক্রান্ত তথ্য গ্রহণ এবং তা আলোচনার জন্যে প্রস্তুত নন। সুতরাং, তরুণদের বর্তমান এসআরএইচআর অবস্থা পরিবর্তন ও পরিমার্জন করতে হলে একটি সামগ্রিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে।
পরিশেষে জাতীয় নীতিতে তরুণদের এসআরএইচআর সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা অন্তর্ভূক্ত করা এবং সরকারি, বেসরকারি ও সমাজের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে অবিলম্বে কার্যক্রম শুরু করার আবশ্যিকতা উল্লেখ করে আলোচনাসভাটি সমাপ্ত হয়।
