সামাজিক অবক্ষয় রোধে

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:৩৮ এএম

বিবেক ও সংকল্পের সংকট থেকে সামাজিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়। এ দুটি বিষয়ে দুর্বল হয়ে পড়লেই মানুষ নৈতিকতা হারিয়ে অন্ধকার পথে পা বাড়ায় এবং সমাজে নীতিহীনতা ছড়ায়। আর সামাজিক অবক্ষয় প্রকট হয়ে উঠলে দেশ-জাতির পতন অনিবার্য। কোরআনে কারিমে বিভিন্নভাবে সামাজিক অবক্ষয়ের কথা এসেছে সঙ্গে প্রতিকারের পথও বাতলে দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসংগত কাজ ও অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা স্মরণ রাখো। (সুরা নাহল, আয়াত : ৯০)

আয়াতে সামাজিক অবক্ষয়কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। এক. অশ্লীলতা, দুই. অসংগত কর্মকা-, তিন. আইন লঙ্ঘন। সব ধর্ম ও সমাজেই এসব বিষয় অবক্ষয় হিসেবে স্বীকৃত। এসবের বৈধতা দিলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং মানুষের জান-মাল ইজ্জত-আব্রু অনিরাপদ হয়ে পড়ে।

সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিকারে বেশ কিছু করণীয় ও শিষ্টাচার অর্জনের কথা কোরআনে বিবৃত হয়েছে। কয়েকটি শিষ্টাচার এখানে তুলে ধরছি

আল্লাহভীতি

মনের পবিত্রতা ও সৎ কাজের নামই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, বিনয়, ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ, সত্যকথন, সুসম্পর্ক স্থাপন সবই তাকওয়া বা আল্লাহভীতির অন্তর্ভুক্ত। এসব শিষ্টাচারের অনুপস্থিতি সামাজিক অবক্ষয় ডেকে আনে। যেমন লোভ-লালসা, অশ্লীলতা, অপব্যয়, মিথ্যাবাদিতা, ঘুষ, জুয়া, ওজনে বেশকম করা, পরচর্চা ইত্যাদি। কোরআনে কারিমে এসব বিষয়কেই ‘অশ্লীলতা ও অসংগত কাজ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসবের প্রতিকার হিসেবে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

শালীনতা

অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতার একমাত্র প্রতিষেধক শালীনতার পথ অবলম্বন এবং অশোভন কর্মকা- থেকে বিরত থাকা। শালীনতা ও লজ্জাই পারে অবক্ষয়ের পথে পা ফেলা মানুষগুলোকে রুখে দিতে। আর নামাজ আল্লাহর সামনে লজ্জাশীল ও বিনয়াবনত হওয়ার শ্রেষ্ঠ সুযোগ। এ কারণেই নামাজ অবক্ষয় রোধের প্রধান নিয়ামক যেমনটি উপর্যুক্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন। রাসুল (সা.) শালীনতা ও লজ্জাশীলতার উপকারিতা বর্ণনা করে বলেন, ‘লজ্জাশীলতার পুরোটাই কল্যাণ।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১১৭; মুসলিম, হাদিস : ৩৭)

ন্যায়পরায়ণতা

যাপিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতা অপরিহার্য। আবেগের স্রোতে ভেসে যাওয়া বিবেককে রুখতে প্রয়োজন ইনসাফভিত্তিক সমাজব্যবস্থা। ন্যায়পরায়ণতা মানুষের মধ্যে সুস্থ বিবেক তৈরি করে এবং মানুষে মানুষে সৃষ্ট ভেদাভেদ মিটিয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, ইহসান ও নিকটাত্মীয়দের দান করতে নির্দেশ দেন। (সুরা নাহল, আয়াত : ৯০) এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা আরও ইরশাদ করেন, ‘ইনসাফ করো, এটা তাকওয়ার অতীব নিকটবর্তী। (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৮)

ক্ষমাপ্রদর্শন

সামাজিক অবক্ষয় রোধে কোরআনের আরেকটি প্রেসক্রিপশন হলো ক্ষমাপ্রদর্শন। মন্দকাজের প্রতিদান ভালো কাজ দিয়ে দেওয়াই ইসলামের শিক্ষা। মহানবী (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান নয়। উৎকৃষ্ট পন্থায় জবাব দিন। তখন দেখবেন আপনার সঙ্গে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু (হয়ে যাচ্ছে)।’ (সুরা হা-মীম আয়াত : ৩৪)

অজ্ঞদের ক্ষমা করা এবং তাদের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ দেখানো অবশ্যই ভালো কাজ। আল্লাহতায়ালা সব ভালো কাজের প্রতিদান দেবেন। সুন্দর, মার্জিত ও ন্যায়সংগত আচরণ পেলে মানুষ খারাপ বিষয়গুলো অনুধাবন করতে শেখে এবং তা থেকে বিরত থাকতে সচেষ্ট হয়। তাই সামাজিক অবক্ষয় রোধে ক্ষমার পথ অবলম্বনের বিকল্প নেই। অন্যায় ও অসৎ কাজের প্রতিদান আপনি সততা ও বিনয়ের মাধ্যমে দিন, আপনার এই প্রচেষ্টা বৃথা যাবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ভালো কাজ ধুয়ে দেয় মন্দ কাজকে।’ (সুুরা হুদ, আয়াত : ১১৪)

উত্তম চরিত্র

অনুপম শিষ্টাচারে জীবন রাঙানো মানুষদের আল্লাহ তার ‘বিশেষ বান্দা’ আখ্যায়িত করেন। আল্লাহতায়ালা কোরআনের পাতায় তাদের গুণাগুণ বয়ান করে বলেন, ‘পরম করুণাময়ের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্র-বিনয়ী হয়ে চলাফেরা করে। অজ্ঞরা তাদের সম্বোধন করে কিছু বললে, তারা বলে ‘সালাম’। এবং তারা রাতযাপন করে পালনকর্তার দরবারে সেজদাবনত ও দ-ায়মান হয়ে। এবং তারা বলে, ওগো পালনকর্তা, আমাদের কাছ থেকে জাহান্নামের আজাব হটিয়ে দিন। জাহান্নামের শাস্তি নিশ্চিত বিনাশ ঢেকে আনবে। তা কতই না নিকৃষ্ট আবাসন! এবং তারা অপব্যয়ও করে না, কৃপণতাও করে না, বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী পন্থা বেছে নেয়। এবং তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে উপাস্য স্বীকার করে না, আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছেন, সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। ব্যভিচারে জড়ায় না। যারা এ কাজ করে তারা শাস্তির মুখে পড়বে।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৩-৬৮)

অন্যান্য গুণ

এ ছাড়াও সামাজিক অসংগতি ও অবক্ষয় রোধে আরও যা দরকার তন্মধ্যে নিষ্ঠা, আল্লাহর ওপর ভরসা, ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা অন্যতম। আপনার ভেতর থাকতে হবে ইখলাস ও একনিষ্ঠতা, দীনদারি ও নৈতিকতা। থাকতে হবে আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাস ও অবিচল আস্থা। শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিজেকে সামলে রাখতে আপনার ভেতরে চাই ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা।

তাকওয়া মন-মানসকে বলিষ্ঠ ও সজীব করে। তাইতো তাকওয়াকে শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্যের মাপকাঠি বলা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান, তিনিই সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

ইখলাস ও নিষ্ঠার অর্থ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার মানসেই কাজ করা। মানুষের ভেতর যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রেরণা জেগে ওঠে, তখন সমাজ থেকে অন্যায়-অনাচার বিদূরিত হয়। আল্লাহর ভয় অন্তরে থাকলে কেউ অন্যায়ে লিপ্ত হতে পারে না, অন্যের অধিকার আত্মসাৎ করতে পারে না। পারে না কাজে ও বিশ^াসে বৈপরীত্য রাখতে। তেমনিভাবে বিপদ-আপদে ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন সফলতার চাবিকাঠি। নিজেকে সামলে নিয়ে মার্জিত জীবনযাপন করতে পারলে সমাজ হয়ে ওঠে সুখ-সৌন্দর্যের কল্পপুরী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত