ক্ষুদ্রশিল্পের ছোট উদ্যোক্তাদের বাঁচাতে হবে

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৭:১৬ এএম

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি : বড়রা পাচ্ছে ছোটরা ঘুরছে।’ করোনার অভিঘাতে আমাদের দেশের ছোট-বড় সব উদ্যোক্তা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই কথা অস্বীকার করার সুযোগ আছে কি না প্রশ্ন থেকে যায়। করোনার শুরুর দিকে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে  স্থবিরতা নেমে আসে। অনেক মানুষ কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে বাধ্য হন। নানাবিধ মাধ্যমে আমরা এই তথ্যগুলো পেয়েছি।

পুঁজি বেশি হলে বড় উদ্যোক্তারা সহজে প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেন। পুঁজি কম হলে ছোট উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে ওঠাই কঠিন হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে ঋণ বা প্রণোদনার প্রয়োজনটা তাদেরই বেশি। কিন্তু দেশের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। করোনার ধকল কাটিয়ে ওঠার প্রণোদনা ঋণের বেশিরভাগই পেয়েছেন বড় উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান। এমনকি খবরের কাগজে দেখেছি যে বড় উদ্যোক্তারা এই ঋণ নিয়ে চড়া সুদে ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করছেন। সরকার করোনাকালে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় ১ লাখ ১১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার ২০টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। তন্মধ্যে ঋণ আকারে ব্যাংকিং চ্যানেলে ৮৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা।

প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় সোনালী ব্যাংক ১ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা (লক্ষ্যমাত্রার ৭৭.৬৩ ভাগ), জনতা ব্যাংক ৪৫৮ কোটি টাকা (লক্ষ্যমাত্রার ৯৩.৪৭ ভাগ), অগ্রণী ব্যাংক ৬৮২ কোটি টাকা (লক্ষ্যমাত্রার ৬৬.৬৬ ভাগ), রূপালী ব্যাংক ৩০৩ কোটি টাকা (লক্ষ্যমাত্রার ৩৭.১৩ ভাগ) এবং বেসিক ব্যাংক ৩৪ কোটি টাকা (লক্ষ্যমাত্রার ৩২ ভাগ) বিতরণ করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বড় শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৩৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজের মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। শতাংশের হিসাবে বড় শিল্প ও সেবা খাতে এই ঋণ বিতরণের হার প্রায় ৭৮ শতাংশ। (প্রথম আলো, ৩০ নভেম্বর ২০২০)।

অন্যদিকে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি বা ‘সিএমএসএমই’ উদ্যোক্তাদের খুব কমই ঋণ পেয়েছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনেকেই জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও ব্যাংকগুলো থেকে কোনো সাড়া পাননি। আবার কৃষিঋণ পেতেও কৃষকরা একইরকম ভোগান্তিতে আছেন।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্পের অন্তর্গত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও লাভজনক শিল্প হলো মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে যেসব শিল্প গড়ে উঠেছে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম মোবাইল ফোন আসে। কিন্তু এর বিশ বছর আগেই, ১৯৭৩ সালে বিশ্ববাসী মোবাইল ফোনের আগমনী বার্তা জানতে পারে। পুরাতন পত্র-পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে জানা যায় আবিষ্কৃত প্রথম মোবাইল ফোনের ওজন ছিল এক কেজির মতো। মুষ্টিমেয় জনগণ বা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার শুরু হয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে শুধু ফোনের মাধ্যমে কথার আদান-প্রদানই ছিল প্রধান কাজ। সেটাকে আমরা ভয়েস ট্রান্সফার বলে থাকি। কিন্তু দিনবদলের দিনে সেই ফোন এখন স্মার্ট থেকে স্মার্টতর হয়ে ছোট্ট একটি কম্পিউটারে পরিণত হয়েছে। যা ভয়েস ট্রান্সফারের কাজ ছাড়াও অনেক সেবা দিয়ে থাকে। তাই মোবাইল ফোন সারা বিশ্বে যোগাযোগের সবচেয়ে জনপ্রিয় এক মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

এখন মোবাইল ফোন এবং এ সংক্রান্ত নানাবিধ সেবাকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক মানুষের আয় করবার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে যেমন হ্যান্ডসেট বিক্রি আর কার্ড বিক্রির জন্য এজেন্সিশিপ নেওয়ার ধুম পড়ে তেমনি আস্তে আস্তে শুরু হয় মোবাইল রিপেয়ারিংয়ের কাজ। সেই সময় বিদেশ থেকে অনেকেই ফোন সেট নিয়ে আসতেন। সেটার কান্ট্রি লক থাকার কারণে বাংলাদেশের স্বল্প পরিসরে গড়ে ওঠে লক খোলা ও কিছু রিপেয়ারিংয়ের দোকান। ফলে অনানুষ্ঠানিকভাবে ও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠে এক নতুন শিল্প। বলা যায় সেই সময় হাতিরপুলে অবস্থিত ইস্টার্ন প্লাজায় এই শিল্প গড়ে ওঠে। এখন বাংলাদেশের এমন কোনো থানা, গ্রাম নেই যে মোবাইলকে কেন্দ্র করে কোনো দোকান বা কোনো সেবা গড়ে ওঠেনি।

এভাবে মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নতুন এক ক্ষুদ্রশিল্প। যা বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এদেশের অনেকেই এই শিল্পের ওপরে আস্থা রেখে এই শিল্পকে বড় করেছে। রাখছে আমাদের অর্থনীতিতে অবদান। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও পুঁজির ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে আলাদা আলাদা সেবা। যেমন একজন একটা টেবিল নিয়ে রাস্তার ধারে বসে শুধু সিম বিক্রি করে, কেউবা ফ্লেক্সিলোড সেবার সঙ্গে সিম বিক্রি করে থাকে। আবার দেখি ছোট ছোট দোকানে শুধু ফোন রিপেয়ারিংয়ের কাজ করে থাকে। আবার অনেকেই শুধু মোবাইল এক্সেসরিজ বিক্রি করে থাকে। এমনকি একটা বোর্ডে অনেকগুলো প্লাগ সংযোজন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শুধু মোবাইল চার্জের ব্যবস্থা করেও অনেকের আয়ের পথ হয়েছে। ঢাকার এমন কোনো শপিংমল নেই যেখানে একটা ফ্লোর মোবাইল সংক্রান্ত ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে বরাদ্দ নেই। বর্তমানে এই ধরনের পেশায় অনেকেই জড়িত এবং এর প্রসার বাড়ছে। এটা খুবই অবাক করার মতো বিষয় যে, এমন ইনফরমাল মার্কেট কীভাবে টিকে থেকে ব্যবসা করে যাচ্ছে।

এই ব্যবসা বা শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা শুধুমাত্র দেশের ভেতরে না, বাইরের বাজারের ওপরে অনেকটা নির্ভরশীল। শিল্পপণ্যের জোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে তাদের আয় নির্ভর করে যা অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুসারেই। এখন করোনাভাইরাসের কারণে এই পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার ফলে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেকেই ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছেন। পণ্যের চাহিদা না থাকায় তাদের বিক্রি বা সেবা কমে গিয়েছে।  ফলে যারা ব্যাংক লোন নিয়ে ব্যবসা করছেন তারা সময় মতো ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেকেই আবার নতুন করে এই শিল্পে উদ্যোক্তা হয়েছেন, তারাও হতাশ হয়েছেন। এই সব বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকারসহ যারা নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আছেন তারা যেন একটু ভাবেন যাতে করে এই শিল্পে বড় ধরনের কোনো আঘাত যেন না আসে। যারা এই সব শিল্পের মালিক তাদের টিকে থেকে তাদের কর্মচারীদেরও টিকে থাকার জন্য সাহস জোগাতে হবে।

আমাদের অর্থনীতিতে এই শিল্পের অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যা কিনা ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা পেলেও এই অর্থনৈতিক মন্দা তাদের একার পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সারা দেশে ২০১৯ সালের এক জরিপে দেখা যায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবদান মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ। এই ৫ শতাংশের কিছু অংশ মোবাইল সংক্রান্ত এই শিল্প থেকেই আসে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই শিল্পকে বাঁচাতে যে পরিমাণ মনোযোগ দরকার তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এখন নেই কিন্তু সামনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলাতে যেমন আমাদের ভাবতে হবে তেমনি এই শিল্পের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই গোষ্ঠীকে কীভাবে অনিশ্চয়তা থেকে সহায়তা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা যেমন অতীব জরুরি, তেমনি দরকার জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া। যারা এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তাদের সঙ্গে নিয়ে এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এখন সময়োপযোগী সমন্বয় দরকার।

কিছুদিন আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ভার্চুয়াল বৈঠকে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতে ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণ শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো তথ্যের ঘাটতি। অর্থাৎ ব্যাংকের কাছে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের তথ্যাবলি যথেষ্ট পরিমাণে থাকলেও ছোট ছোট শিল্পের তেমন কোনো তথ্য নেই। বড় উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজনীয়তা যেমন আছে তেমনি আছে ছোট উদ্যোক্তাদেরও। রপ্তানির বাজার ফিরে পেতে এসব বড় বড় শিল্প নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু অধিক শ্রমশক্তিনির্ভর ছোট উদ্যোক্তাদেরও বাঁচাতে হবে।

সরকারের অর্থ বিভাগ করোনা প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে সম্প্রতি তিনটি মতবিনিময় সভা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে। যার প্রথম মতবিনিময় সভাটি হয়েছে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গত ২৬ নভেম্বর। এই সভার প্রতিপাদ্য ছিল ‘টেকসই কর্মসংস্থান এবং সার্বিক অর্থনৈতিক চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা’। আরও দুটি সভা ৩ ডিসেম্বর এবং ১০ ডিসেম্বর হওয়ার কথা। সভার প্রতিপাদ্য বিষয় যথাক্রমে ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুজ্জীবিতকরণ’ এবং ‘সামাজিক সুরক্ষা জালের বিস্তার ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।’

করোনাভাইরাসের অভিঘাত মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের অংশ এগুলো। আমরা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আমরা আশা করব, সরকার কেবল নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করবে না, সেই নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলো যাতে দ্রুত ঋণ বিতরণ করে, সেটিও তারা নিশ্চিত করবে। করবে তদারকি। অন্যান্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্প যেমন বেঁচে থাকবে, তেমনি করে মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে যারা জীবিকা নির্বাহ করছে তারাও যেন বেঁচে থাকে।

লেখক ব্যাংকার ও গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত