২০১৯ সালের জুনে কুলাউড়ার বরমচালে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যান চার যাত্রী, আহত হন শতাধিক। প্রতি বছর সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ১৫-২০টি ছোট ছোট দুর্ঘটনা ঘটছেই। চলতি বছর দীর্ঘদিন করোনার কারণে রেল চলাচল বন্ধ থাকলেও আগস্ট থেকে চালু হওয়ার পর মাত্র পাঁচ মাসে সিলেট-আখাউড়া রুটে ছয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৭৯ কিলোমিটার আখাউড়া-সিলেট রেলপথের পুরোটাই জরাজীর্ণ। এই সেকশনে ৯০ শতাংশ সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ। তার মধ্যে ১৩টি মহা-ঝুঁকিপূর্ণ সেতু (ডেডস্টপ)। সেই সঙ্গে এই রুটের সব ট্রেনের বগি-ইঞ্জিন অনেক পুরনো।
রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের তথ্য মতে, নির্মাণের ৫০-৫৫ বছর পরই সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। অথচ এ রুটের ৯০ শতাংশ সেতুর বয়সই ৭০ বছর পেরিয়েছে। রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ এ রকম ১৩টি স্পটকে ‘ডেডস্টপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সিলেট থেকে মোগলাবাজার স্টেশন পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে আটটি এবং মোগলাবাজার থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ১৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে পাঁচটি সেতু ডেডস্টপ।
১৬ আগস্ট থেকে গত রবিবার পর্যস্ত এ রুটে ছয়টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত রবিবার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে মাধবপুরের শাহাজীবাজার রেলস্টেশনের পাশে তেলবাহী ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। এ কারণে ১৩ ঘণ্টা সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে। এর আগে ১১ নভেম্বর সিলেট ও মৌলভীবাজারের মধ্যবর্তী ভাটেরায় মালবাহী ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে। এতে বন্ধ হয়ে যায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ।
এর আগে ৭ নভেম্বর সাতটি বগি নিয়ে শ্রীমঙ্গলে তেলবাহী একটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়। এতে ২৩ ঘণ্টা বন্ধ থাকে রেল যোগাযোগ। একই স্থানে ২০১৮ সালে ১১টি বগি নিয়ে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর সিলেট রেলস্টেশনে ডকইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের সামনের দিকে ধাক্কা দেয় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস। ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও এলাকায় তেলবাহী ওয়াগনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ২৩ আগস্ট যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয় কুলাউড়া এলাকায়। একই স্টেশনে গত ২৪ জানুয়ারি ট্রেনের বগিতে আগুন ধরে যায়। এভাবে দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়তই।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ রুটে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে গত বছরের ২৩ জুন। এদিন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় উপবন এক্সপ্রেসের পাঁচটি বগি সেতু ভেঙে ছড়ায় পড়ে যায়। এতে চারজন নিহত ও শতাধিক যাত্রী আহত হন। ২১ ঘণ্টা পর রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়। গত এক বছরে সিলেট-আখাউড়া রুটে কী পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তার তথ্য দিতে পারেননি সিলেটের স্টেশন মাস্টার জাহাঙ্গির আলম।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, সিলেট-কুলাউড়া-আখাউড়া সেকশনে আগে ট্রেন চলত ৭০-৮০ কিলোমিটার গতিতে। এখন সেই গতি অর্ধেকে অর্থাৎ ৪০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।
সিলেট রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, এক বছরে এ লাইনে যত দুর্ঘটনা হয়েছে, আমার ছয় বছরের চাকরিজীবনেও এত দুর্ঘটনা দেখিনি। সরকার এ রুটের জন্য বড় আকারের প্রকল্প নিয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে আর দুর্ঘটনা থাকবে না।
