সৌদি নেতৃত্ব, বিশেষ করে দেশটির প্রবল ক্ষমতাশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন কিছুটা অস্বস্তিকর সময় পার করছেন। তিন সংকটে চাপে আছেন এমবিএস নামে পরিচিত সৌদির এই ‘ডি ফ্যাক্টো’ শাসক।
সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যায় এমবিএসের জড়িত থাকার অভিযোগ ছাড়াও তাকে তিনটি সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
বিবিসি বলছে, এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসন হোয়াইট হাউসে যখন দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন স্পষ্ট বলে দিয়েছেন- কোনো কোনো সৌদি ইস্যুতে তিনি তার পূর্বসুরীর চেয়ে কঠোর অবস্থান নেবেন।
ইয়েমেন যুদ্ধ
এই যুদ্ধে জড়িত প্রায় সব পক্ষের জন্যই এটা একটা বিপর্যয়। বিশেষ করে ইয়েমেনের দরিদ্র এবং পুষ্টিহীন জনগোষ্ঠীর জন্য।
সৌদি আরব এই যুদ্ধ শুরু করেনি, করেছিল হুথিরা। তারা ২০১৪র শেষ দিকে রাজধানী সানায় অভিযান চালিয়ে বৈধ সরকারকে উৎখাত করে। হুথিরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকার একটি উপজাতি গোষ্ঠী এবং সংখ্যার হিসাবে তারা দেশটির জনসংখ্যার ১৫ শতাংশেরও কম।
গত ২০১৫ সালের মার্চে এমবিএস যখন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি কয়েকটি আরব রাষ্ট্রকে নিয়ে গোপনে একটি জোট গঠন করে ইয়েমেনে বিশাল বিমান আক্রমণ চালান। আশা করেছিলেন, প্রবল বিমান হামলার মুখে হুথিরা কয়েক মাসের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করবে।
কিন্তু প্রায় ছয় বছর ধরে লড়াইয়ে কয়েক হাজার নিহত ও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরেও সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোট সানা এবং ইয়েমেনের জন-অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চল থেকে হুথিদের হঠাতে পারেনি। এই ছয় বছরে দুই পক্ষই যুদ্ধাপরাধও সংঘটিত করেছে।
ইরানের সহযোগিতায় হুথিরা ক্রমশই আরও নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিস্ফোরক ড্রোন ছুড়েছে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে। তাদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র এমনকি জেদ্দা পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং তেল স্থাপনাগুলোকে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে।
অর্থের হিসাবে এই অচলাবস্থা সৌদিদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু শান্তি পরিকল্পনাই একের পর এক ভেস্তে গেছে।
ইয়েমেনের যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে বহু ইয়েমেনি। কিন্তু সৌদিদের এই রক্তক্ষয়ের জন্য চড়া আর্থিক মূল্য দিতে হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বাইরে তাদের বিরাট সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
সৌদিরা চায় এই অচলাবস্থা থেকে এমন একটা পরিত্রাণ যাতে অন্তত তাদের মুখরক্ষা হবে। কিন্তু সৌদিরা ‘তাদের দক্ষিণ সীমান্তে ইরানের একটা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলা বন্ধের’ কথা ইতোমধ্যেই বলেছে।
তারা জোর দিয়ে বলেছে, ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র মিলিশিয়ারা ইয়েমেনে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে এটা তারা কখনই মেনে নেবে না। তবে সৌদিদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দিন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। যে কোনোভাবে এখন এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ বাড়ছে।
বারাক ওবামা ২০১৬ সালে তার ক্ষমতার শেষ দিকে সৌদি আরবের প্রতি মার্কিন সহায়তা অনেকটাই খর্ব করেছিলেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর সেটা উল্টে দেন এবং রিয়াদ যত ধরনের গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক সরঞ্জাম চেয়েছে আমেরিকা তার পুরোটাই দেয়। এখন বাইডেনের প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে এই সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার।
বন্দি নারীরা
সৌদি আরবের ১৩ জন শান্তিপূর্ণ নারী আন্দোলনকারীকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। সৌদি নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করার প্রচারণায় এটা একটা বড় বিপর্যয়।
বন্দিদের কাউকে কাউকে ভয়ানকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। এদের অপরাধ কার্যত নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার দাবি করা এবং পুরুষ অভিভাবকের অধীনে থাকার ;চরম অন্যায্য পদ্ধতি’র অবসান চাওয়া।
এদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত বন্দী লুজাইন আল-হাথলুল সহ অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয় ২০১৮ সালে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঠিক আগে আগে।
সৌদি কর্মকর্তারা এখনো অভিযোগ করছেন, মিস হাথলুল গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তিনি ‘বিদেশি শক্তির কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন’। কিন্তু এর সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ সৌদি কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেননি।
কাতার বয়কট
দৃশ্যত, এই ইস্যুটি পর্দার আড়ালে দীর্ঘ দিন ধরে চালানো কুয়েতি মধ্যস্থতায় সমাধান হয়ে গেছে বলেই মনে হবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এই সমস্যার শেকড় অনেক গভীরে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালে রিয়াদ সফর করার কয়েক দিনের মধ্যেই সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহারাইন এবং মিশরের সঙ্গে মিলে তাদের উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ কাতারকে খোঁড়া করে দেওয়ার মতো বিধ্বংসী বয়কট বা বর্জনের পদক্ষেপ নেয়।
তাদের অভিযোগ ছিল, কাতার ইসলামপন্থী যে দলগুলোকে সমর্থন করছে তাদের কর্মকাণ্ড সন্ত্রাসবাদের পর্যায়ে পড়ে এবং এটা অগ্রহণযোগ্য।
আমিরাত যেসব অভিযুক্ত সন্ত্রাসী কাতারে বাস করছে তাদের সম্পর্কিত একটি নথি প্রকাশ করে। কিন্তু কাতার কোনোরকম সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
এছাড়া তাদের প্রতিষ্ঠিত ও সুপরিচিত টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই চারটি দেশের জোটের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানায় কাতার।
ইয়েমেনে হুথিদের মতোই সৌদিদের একটা ভুল প্রত্যাশা ছিল যে, কাতারীরা চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে এবং তাদের শেষ পর্যন্ত বশ্যতা মেনে নেবে। কিন্তু তারা তা নেয়নি।
এর কারণ অংশত কাতারের রয়েছে বিপুল সম্পদ। কাতারে উপকূলবর্তী তেল উৎপাদনের ক্ষেত্র রীতিমতো বিশাল এবং শুধু ব্রিটেনের অর্থনীতিতেই কাতারের বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন পাউন্ড (৫৩ বিলিয়ন ডলার)। এছাড়াও তাদের পেছনে রয়েছে তুরস্ক ও ইরানের সমর্থন।
এর ফলে যেটা দাঁড়িয়েছে সেটা হলো- মধ্য প্রাচ্যে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে একটা বিরাট বিভাজন রেখা তৈরি হয়ে গেছে। এর একদিকে আছে তিনটি রক্ষণশীল, সুন্নি উপসাগরীয় আরব রাজতন্ত্র- সৌদি আরব, আমিরাত ও বাহরাইন এবং তাদের মিত্র মিশর।
অন্যদিকে আছে কাতার, তুরস্ক এবং রাজনৈতিকভাবে ইসলামী যেসব আন্দোলনকে তারা সমর্থন করে, যেমন মুসলিম ব্রাদারহুড এবং গাজার হামাস গোষ্ঠী।
সাড়ে তিন বছর ধরে কাতারকে বয়কটের এই নীতির কারণে দু পক্ষই যে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এছাড়াও এর মধ্যে দিয়ে যেটা সামনে এসেছে, সেটা হলো- উপসাগরীয় এলাকায় আরব সংহতির আদর্শ আসলেই একটা অর্থহীন বিষয়। আর এটা ঘটেছে এমন সময় যখন উপসাগরীয় আরব নেতাদের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশই বাড়ছে।
এই বিবাদ মীমাংসার ব্যাপারে চাপ দিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত হিসাবে জারেড কুশনার উপসাগরীয় এলাকা সফরে গেছেন। বাইডেনের প্রশাসনও নিঃসন্দেহে চাইবে এই সমস্যার সমাধান। এর আরও একটা কারণ হলো কাতারের আল-উদাইদে রয়েছে বিদেশে পেন্টাগনের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি।
কিন্তু মধ্যস্থতার মাধ্যমে যে সমাধান মীমাংসাই হোক, সেটার বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় কথা।
প্রতিবেশী দেশগুলোকে ক্ষমা করতে কাতারের হয়তো অনেক বছর সময় লেগে যাবে। অন্যদিক থেকে কাতারের ওপর বিশ্বাস পুনরুদ্ধারের জন্যও এই চারটি দেশ হয়তো অনেক বছর সময় নেবে।
