জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ও পলাতক চার খুনি শরীফুল হক ডালিম, মোসলেহ উদ্দিন ওরফে মুসলেম উদ্দিন, এএম রাশেদ চৌধুরী ও এবিএমএইচ নূর চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাওয়া খেতাব স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে চারজনের খেতাব বাতিলে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এ মর্মে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। চারজনের খেতাব বাতিল চেয়ে করা একটি রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আদেশ বাস্তবায়নের পাশাপাশি রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম (এ কে) খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) তুষার কান্তি রায়।
চার খুনির খেতাব বাতিল চেয়ে গত ৩ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুবীর নন্দী দাস এ রিট আবেদনটি করেন। এতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে সরকার ৭ জনকে বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জনকে বীরউত্তম, ১৭৫ জনকে বীরবিক্রম ও ৪২৬ জনকে বীরপ্রতীক উপাধি দেয়। একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট জারি হয়। এর মধ্যে শরীফুল হক ডালিমকে বীরউত্তম, নুর চৌধুরীকে বীরবিক্রম এবং রাশেদ চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিনকে বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হয়। জাতির পিতাকে হত্যাকারী এ চারজনের খেতাব এখনো বাতিল করা হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরকম পরিস্থিতিতে খেতাব বাতিলের নজির রয়েছে।
রিটকারীর আইনজীবী এ কে খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আদালতকে দেখিয়েছি যে, বীরত্বসূচক যে খেতাব সেটি কারও অধিকার নয়। রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যারা খেতাব পেয়েছেন তারা পরবর্তীকালে কোনো অপরাধজনক কার্যক্রম করলে তা ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে। ১৯১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে ৯০০ সৈনিকের বীরত্বসূচক খেতাব ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, কানাডাসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশের নজির উল্লেখ করে বলেছি, সেখানে এ সংক্রান্ত কমিটি রয়েছে এবং খেতাব বা এই সম্মানের হানি ঘটলে তা কেড়ে নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ বিষয়ে “কলঙ্ক নিরোধ আইন” রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বীরত্বসূচক খেতাবের তালিকায় জাতির পিতা স্বাক্ষর করেছিলেন। ওনার স্বাক্ষরে এ চারজন খেতাব পেলেন, কিন্তু তারাই জাতির পিতাকে হত্যা করলেন। এ চেয়ে দুঃখজনক কিছু হতে পারে না। যারা জাতির পিতাকে হত্যা করতে পারেন তারা কোনো খেতাবধারী হতে পারেন না। আদালত বক্তব্য শুনে তাদের খেতাব স্থগিতের পাশাপাশি রুল দিয়েছে। রুল নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত চারজনের খেতাব স্থগিত রাখতে বলেছে হাইকোর্ট।’
প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার দীর্ঘদিন পর আদালতের রায়ে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাতে পাঁচ খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ ও একেএম মহিউদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এছাড়া দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি আবদুল মাজেদ। গত ১১ এপ্রিল তার ফাঁসি কার্যকর হয়। তবে এখনো পলাতক পাঁচ খুনির মধ্যে রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে এবং নূর চৌধুরী কানাডায় রয়েছেন বলে সরকার নিশ্চিত হয়েছে। খন্দকার আবদুর রশিদ, শরীফুল হক ডালিম ও মোসলেহ উদ্দিন কোন দেশে অবস্থান করছেন সে বিষয়ে এখনো সরকার নিশ্চিত হতে পারেনি।
