কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ৪৮ শ্রম পরিদর্শকের এসিআর জালিয়াতির তদন্ত শেষ হয়নি ১ বছরেও। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অবসরে যাওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে তদন্ত কমিটির প্রধানের। আর একজন সদস্য যাচ্ছেন এক বছরের দীর্ঘ মেয়াদি প্রশিক্ষণে। এ অবস্থায় তদন্ত শেষ করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ৪৮ শ্রম পরিদর্শকের এসিআর জালিয়াতি তদন্ত করার জন্য গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। শ্রম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মোল্লা জালাল উদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটিতে একই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাসকে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়। কমিটির বাকি দুই সদস্য হচ্ছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) একজন প্রতিনিধি। কার্যপরিধিতে তদন্ত শেষ করার কোনো সময়সীমা উল্লেখ না থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে শম্বুকগতিতে তদন্ত করে বছর পার করেছে কমিটি। এরই মধ্যে তদন্ত কমিটির প্রধান ড. মোল্লা জালাল উদ্দীন আগামী ৯ ফব্রুয়ারি পিআরএলে (অবসর-উত্তর ছুটি) যাবেন। ইতিমধ্যে তার পিআরএলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আর কমিটির সদস্য যুগ্ম সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাস যাচ্ছেন ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে বছর মেয়াদি এনডিসি কোর্স করতে। এই কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য আজিমুদ্দিন বিশ্বাসকে ওএসডি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এসব প্রজ্ঞাপনের ফলে কমিটির দুই সদস্যই কার্যত শ্রম ও কর্মস্থান মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছেন।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মোল্লা জালাল উদ্দীন গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আশা করি পিআরএলে যাওয়ার আগেই তদন্ত শেষ হবে। এখনো পিআরএল শুরু হওয়ার বেশ কিছু দিন বাকি আছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে মোল্লা জালাল উদ্দীন বলেন, ‘স্বচ্ছতার স্বার্থে এসিআর ঘষামাজার তদন্ত শেষ হওয়া উচিত। তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা গেলে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ হবে।’
গত বছরের জুলাই মাসে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ৪৮ শ্রম পরিদর্শকের পদোন্নতির প্রস্তাব ফেরত পাঠায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি)। প্রস্তাবের সঙ্গে দেওয়া এসিআর রিপোর্টে চাকরির মেয়াদে ঘষামাজা, পদোন্নতির যোগ্যতাসংক্রান্ত মন্তব্যের ঘরে অনুস্বাক্ষর জাল, রিপোর্ট প্রদানকারী কর্মকর্তা ও প্রতিস্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর নকল ছিল। এসব কারণে ৪৮ শ্রম পরিদর্শকের পদোন্নতির প্রস্তাব ফেরত পাঠায় পিএসসি। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতাসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণসহ ফিডার পদধারী সব শ্রম পরিদর্শকের সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রণয়ন, পদবিন্যাসের ছক প্রেরণ এবং জ্যেষ্ঠতা তালিকার বাইরে আর কোনো ফিডার পদধারী না থাকার প্রত্যয়নসহ পুনরায় প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশনা দেয় পিএসসি।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ৪৮ শ্রম পরিদর্শকের এসিআর জালিয়াতির বিষয়টি দেশ রূপান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ঘটনা তদন্তে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ কে এম রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। ওই কমিটি গত বছরের নভেম্বর মাসে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটি এসিআর বিকৃতকারীদের খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়। কমিটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও পিএসসিকে সম্পৃক্ত করে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। ঘষামাজাকৃত এসিআরগুলো হস্তলিপি বিশারদদের দিয়ে পরীক্ষা করারও সুপারিশ করে। রফিকুল ইসলামের তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিব মোল্লা জালাল উদ্দীনকে সভাপতি ও যুগ্ম সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাসকে কমিটির সদস্য সচিব করে চার সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কোনো সময়সীমা বেঁধে না দেওয়ায় কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে শুরুতেই প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠতাসংক্রান্ত বিধিবিধান অনুসরণ না করে জ্যেষ্ঠতা তালিকা ছাড়াই পুনঃপ্রস্তাব পাঠানো হয় পিএসসিতে।
এসিআর জালিয়াতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির তদন্ত চলমান রেখে জ্যেষ্ঠতা তালিকা ছাড়াই পুনঃপ্রস্তাবের বিষয়টি গণমাধ্যমে আবারও প্রকাশিত হয়। এ সময় সংস্থার ১৩ জন সিনিয়র কর্মকর্তা ও পদোন্নতিপ্রত্যাশী ১১ শ্রম পরিদর্শক এসিআর ঘষামাজা ও গণমাধ্যমে অনিয়মের তথ্য প্রকাশের জন্য ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রম পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে গত ফেব্রুয়ারি মাসে আলাদা দুটি অভিযোগ দায়ের করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সংস্থাটির সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) শিবনাথ রায় গত ১৭ জুন ১৪ জন শ্রম পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করেন। বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত ১৪ কর্মকর্তাই ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। একপর্যায়ে আইজির প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করায় বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে এসব কর্মকর্তার মধ্যে সাতজন শ্রম পরিদর্শককে পাঁচ বছর পদোন্নতি স্থগিতের দন্ড প্রদান করা হয়। বাকি সাতজনের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন মহাপরিদর্শক। এই সাতজনের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এদিকে বিভাগীয় মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত সাত শ্রম পরিদর্শক ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় সংস্থার মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায়ের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে এসিআর ঘষামাজা বা বিকৃতিসংক্রান্ত বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামার জবাব দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। গত ২৮ জুন ন্যায়বিচার চেয়ে তারা মন্ত্রিপরিষদ, জনপ্রশাসন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করেন। তারা এই মামলা প্রত্যাহার বা নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বা বোর্ড নিয়োগের মাধ্যমে তদন্ত চেয়েছেন। কিন্তু শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তাদের আবেদনে সাড়া না দেওয়ায় গত ১২ জুলাই সাত শ্রম পরিদর্শককে পাঁচ বছরের পদোন্নতি স্থগিতের দন্ড প্রদান করে। অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের ওপর আস্থা না রেখে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদনের কারণে আবারও সাত শ্রম পরিদর্শকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে যা চলমান রয়েছে।
একপর্যায়ে দ-প্রাপ্ত কর্মকর্তারা সংস্থার মহাপরিদর্শকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসিআর জালিয়াতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি কাজ করছে এবং এ কমিটি এখনো তাদের প্রতিবেদন দেয়নি। এ অবস্থায় এসিআর জালিয়াতির কারণে সাত শ্রম পরিদর্শককে পাঁচ বছরের পদোন্নতির দন্ড প্রদানের বৈধতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, একই সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটির তদন্ত চলমান থাকায় তা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা আরও জানিয়েছেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি সর্বশেষ বৈঠকে ভয়াবহ এসিআর জালিয়াতির বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন চেয়েছে। এ প্রতিবেদন নিয়ে পরের বৈঠকে আলোচনা হবে বলে সংসদীয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে।
