ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ডিজিটাল সম্প্রচারে নতুন বিপ্লব

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:৩০ পিএম

কভিড-১৯ এর তাণ্ডবে বিশ্বব্যাপী লেখাপড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত সবকিছুই প্রায় স্থবির হয়ে যায়। করোনার প্রথম ঢেউয়ের পর এখন দ্বিতীয় ঢেউ চলছে যা প্রথমটি থেকে বহুগুণ শক্তিশালী এবং ধ্বংসাত্মক। অর্থাৎ আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনেক বেশি। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের ভয়ে খুবই সীমিত আকারে ঘরের বাহিরে যাচ্ছে। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঘরে বন্দি মানুষগুলো শিশু, ছেলে-মেয়ে, পরিবার-পরিজন নিয়ে আড্ডা, নাটক, সিনেমা, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বর্জন করে চলছে। কোনোরকম উপায়ান্তর না পেয়ে এবং পেটের জ্বালায় খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষগুলো কাজের সন্ধানে অবাধে (স্বাস্থ্যবিধি না মেনে) ঘোরাফেরা করছে। অন্যদিকে সামর্থ্যবান মানুষরা অনলাইনে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করা, গৃহকর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত করা, নিজ বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে কিংবা ছাদবাগানে ফলমূল ও শাকসবজি চাষ করে ভালোই সময় কাটাচ্ছে। বিনোদন বলতে ফেইসবুকে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করা, বাংলিশ স্টাইলে খবর শোনা, অতি বিরক্তকর বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে অল্প একটু টিভি নাটক দেখা, আর মধ্যরাতে ঝগড়া বিবাদের নামে টকশো শোনা। বলা চলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেকটা বাধ্য হয়েই ওইসব অনুষ্ঠান দেখতে হচ্ছে, তা আবার নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত সময়ে। অর্থাৎ অতি প্রয়োজনীয় কাজ বাদ দিয়ে এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করে ওইসব অনুষ্ঠান আপনি দেখতে বাধ্য। এমনই এক পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের এই দুর্যোগকালে ঘরে বন্দি মানুষগুলোর জন্য তাদের পছন্দানুযায়ী যেকোনো সময় যেকোনো প্রোগ্রাম দেখার প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বিশ্ববাজারে এসেছেওটিটি বা ‘ওভার দ্য টপ’।

ওটিটি-র মাধ্যমে টেলিভিশনের বিভিন্ন ধরনের সিনেমা অথবা যে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান দর্শক দেখতে পারবেন তাদের পছন্দ অনুযায়ী তার পছন্দের ডিভাইসে। সেটি হতে পারে মোবাইল ফোন কিংবা ল্যাপটপ-কম্পিউটার। এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম যার মাধ্যমে টিভিতে কোনো ধরনের স্যাটেলাইট বা তার সংযোগের বদলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিজিটাল বিষয়বস্তু (নাটক, সিনেমার গান ইত্যাদি) পরিবেশন করা হয়। অর্থাৎ ইন্টারনেটের মাধ্যমে দর্শককে সেবা প্রদান করা হয় এবং এজন্য দর্শক তার ইচ্ছেমতো এবং সময়মতো তার পছন্দের কন্টেন্ট দেখতে পারেন। এটিকে ‘ওভার দ্য টপ’ বা ‘ওটিটি’ বলা হয় কারণ এটি কেব্ল বক্সের থেকেও ওপরে (ওভার) দর্শকের সেবা নিশ্চিত করতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন ফি প্রয়োজন। তাই টেলিভিশন মিডিয়ার মতো কোনো বিজ্ঞাপন নেই। ডিজিটাল সম্প্রচারে ওটিটি সামগ্রী হলোঅডিও, ভিডিও এবং অন্যান্য মিডিয়া সামগ্রী যা কন্টেন্টের নিয়ন্ত্রণ বা বিতরণে একাধিক-সিস্টেম অপারেটর (এমএসও) এর সঙ্গে জড়িত না হয়ে ইন্টারনেটে বিতরণ করা হয়। বর্তমান সময়ে  ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, জি-ফাইভ, হটস্টার, উলু, হইচই-সহ এমন হাজারো রকমের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বিনোদন জগতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে এবং এমনকি অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধ হচ্ছে। মানসম্মত কন্টেন্ট, সেবার গুণগত মান, ভাগাভাগির সুবিধা থেকে ওয়েবসাইটের ডিজাইন এবং অ্যানিমেশন এসব কিছুর বিবেচনায় মানুষ প্রতিনিয়তই ঝুঁকে পড়ছে ওটিটি মাধ্যমটির ওপর।

বিনোদন জগতে সাধারণত তিন ধরনের দর্শক থাকে। ট্র্যাডিশনালিস্ট (সনাতনবাদী), কনভেনিয়েন্স সিকার (সুবিধা সন্ধানকারী) ও ডিমান্ডিং সিকার (অভিজাত/দাবি সন্ধানকারী)। প্রথম ধরনের দর্শকদের বিনোদনের মূল মাধ্যমই হলো টিভি। তারা টিভিতে অনুষ্ঠান দেখতে পছন্দ করেন, সেটা যেকোনো প্রোগ্রামই হোক না কেন। দ্বিতীয় শ্রেণির দর্শকরা খুব বেশি সিলেক্টিভ নন তাদের পছন্দের অনুষ্ঠান নিয়ে। তাই তারা সব ধরনের বিনোদন-মাধ্যমেই প্রোগ্রামগুলো সমানভাবে উপভোগ করে থাকেন। তবে অভিজাত বলতে গেলে ডিমান্ডিং সিকার দর্শকরা নতুন এই মাধ্যমটি (ওটিটি) অত্যন্ত পছন্দ করে থাকেন। কেননা এই মাধ্যমটিতে তারা অত্যন্ত রুচিসম্মত অনুষ্ঠানগুলো পেয়ে থাকেন। অনুষ্ঠানগুলো তারা যেকোনো সময় উপভোগ করতে পারেন এবং তাতে বিজ্ঞাপনের জন্য কোনো প্রকার অপেক্ষা করতে হয় না। স্ট্রিমিং সাইটের যাবতীয় সুবিধাকেই তারা নখদর্পণে রাখতে ভালোবাসেন। অভিজাত এই গ্রাহকরা ইন্টারনেট সংযুক্ত ডিভাইস যেমন ফোন (অ্যান্ড্রয়েড, আইওএস এবং উইন্ডোজ ধরনের মোবাইল ডিভাইস), স্মার্ট টিভি (যেমন গুগল টিভি এবং এলজি ইলেক্ট্রনিক্সের চ্যানেল প্লাস) এর মাধ্যমে ওটিটি সামগ্রীতে অ্যাক্সেস করতে পারবেন। অর্থাৎ তথাকথিত ডিশ অ্যান্টেনা, কেব্ল কানেকশন, ব্রডব্যান্ড, ফ্রিকোয়েন্সি কিংবা নির্ধারিত প্যাকেজের বাইরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগের মাধ্যমে বিনোদনের প্রোগ্রামগুলো যখন ইচ্ছা তখন দেখতে পায় বলে এর নামকরণ হয়েছে ওটিটি বা ওভার দ্য টপ।

বিচিত্র ও রুচিশীল কন্টেন্ট এবং সহজলভ্যতাই ওটিটি ওয়েবসাইটগুলোর জনপ্রিয়তা করোনা-পূর্ববর্তী সময়েই বিনোদন জগতে বড় একটা ঢেউ তোলে। আর করোনাকালে ঘরে বসে কাক্সিক্ষত মানের সেবা পেয়ে গৃহবন্দি মানুষের কাছে এই মাধ্যমটি আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বলা যায়, এটি বিনোদনকে নিয়ে এসেছে একদম হাতের মুঠোয়। যেহেতু ওটিটি মূলত একটি স্ট্রিমিং মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে, সেহেতু এই  প্ল্যাটফর্মটিতে ডিজিটাল কনটেন্টের সব প্রোগ্রাম পরিচালনা করা সহজতর হচ্ছে। ফলে এই প্ল্যাটফর্মটির বিনোদন জগতে এনেছে অন্য মাত্রা। কেননা, এখন আর আগের মতো টিভিসেটের সামনে পছন্দের অনুষ্ঠানের অপেক্ষা করতে হয় না। এটির জনপ্রিয়তা অর্জন করার পেছনে আরও একটি কারণ হলো এর বিজ্ঞাপন বিরতিহীন অনুষ্ঠান। করোনা আবহে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বিগ বাজেটের সিনেমাগুলো সিনেমা হলকে বাইপাস করে সরাসরি ওটিটি প্লাটফর্মে পরিবেশিত হচ্ছে। সময়ের স্রোতে তাই বিনোদনপ্রিয় মানুষগুলো রেডিও থেকে টিভিতে অভ্যস্ত হতে যেমন খুব বেশি সময় নেয়নিতেমনি টিভি থেকে ডিশ অ্যান্টেনায় আসতেও কালক্ষেপণ করেনি। এমনিভাবে ডিশ অ্যান্টেনা থেকে ওটিটি-তে আসতেও দেরি তো দূরের কথা, মহামারী করোনাও কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

‘বিনোদন’ মানুষের অন্যান্য মৌলিক চাহিদার মতোই একটি অপরিহার্য বিষয় বললে ভুল হবে না। মানুষ তাই সমাজ-সংসারের পাশাপাশি বিনোদনকে লালন-পালন করে আসছে পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকেই। আজকের যুগেও সেই চাহিদা রয়েছে অডিও-ভিডিও-ওটিটি, ৩-জি, ৪-জি যাই হোক না কেন। তবে একথা ঠিক যে, সময় ও সুযোগের অভাব এবং কর্মব্যস্ততার কারণে মানুষ এসব আধুনিক মিডিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছেআর দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছে। বিনোদনের আসল ও প্রকৃত স্বাদ পেতে হলে নাট্যমঞ্চ, গ্রাম থিয়েটার, সিনেমা হল, অডিটোরিয়াম ইত্যাদির কোনো বিকল্প নেই। তাই করোনা পরবর্তী সময়ে বিনোদনপ্রিয় মানুষগুলো পুনরায় যাতে সরাসরি বিনোদনের অভিজ্ঞতায় ফিরে যেতে পারে সে উদ্যোগও জরুরি। আর কালের পরিক্রমায় সরাসরি বিনোদনের পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতির প্লাটফর্মগুলোকেও স্বাগত জানাবে মানুষ।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত