শীতের আগমনের আগে থেকে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার ২৫টি গ্রাম কম্বল তৈরিতে সরগরম হয়ে ওঠে। এসব গ্রামের ২৫ হাজার মানুষ এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তারা গত ১৮ বছর ধরে এ কাজ করে আসছেন। ফলে গ্রামগুলো কম্বলের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এসব গ্রামের নানা বয়সী মানুষ নতুন ও পুরনো কম্বল তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন এখন।
গ্রামগুলো হলো কাজীপুর উপজেলার শিমুলদাইর, বর্শীভাঙ্গা, সাতকয়া, শ্যামপুর, ছালাভরা, কুনকুনিয়া, পাইকরতলী, ঢেকুরিয়া, বরইতলা, মুসলিমপাড়া, মানিকপটল, গাড়াবেড়, রশিকপুর, হরিনাথপুর, ভবানীপুর, মাথাইলচাপর, রৌহাবাড়ী, পলাশপুর, বিলচতল, লক্ষ্মীপুর, বেলতৈল, চকপাড়া, চালিতাডাঙ্গা, কবিহার ও হাটশিরা।
গত বৃহস্পতিবার সকালে কাজীপুর উপজেলার মাইজবাড়ী, চালিতাডাঙ্গা ও সোনামুখী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ ও শিমুলদাইড় বাজারের কম্বল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
মাইজবাড়ী ইউনিয়নের ছালাভরা বাজারের কম্বল তৈরির একাধিক কারিগর বলেন, প্রতিদিনই কাজের চাপ বাড়ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করছি। তারপরেও কুলিয়ে উঠতে পারছি না। নতুন কাপড়ের নানা রঙের কম্বল তৈরি করছি। এখন দম ফেলার সময় নেই।
এই শিল্পের আরও প্রসারের লক্ষ্যে ও বেকার, অভাবী, অসহায়দের কর্মসংস্থানের জন্য কাজীপুর উপজেলা প্রশাসন এর ওপর প্রশিক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
প্রায় ১৮ বছর আগে যমুনার ভাঙনকবলিত এসব গ্রামের মানুষ বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকত। নদীভাঙনে চাষযোগ্য জমি হারিয়ে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মানুষগুলো বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করত। বিকল্প উপার্জনের পথ হিসেবে ছালাভরা কুনকুনিয়া গ্রামের আব্দুল খালেক তৈরি পোশাক কারখানার বাতিল ঝুট কাপড় জোড়া দিয়ে কম্বল তৈরির কাজ শুরু করেন। কম দামের এ কম্বল অল্প কিছুদিনের মধ্যে নি¤œ আয়ের মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে বাজারে এর চাহিদা ও কদরও বেড়ে যায়। এরপর বর্শীভাঙ্গা গ্রামের ছাইদুল হকও এ ব্যবসা শুরু করেন। ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কারখানা থেকে ঝুট কাপড় কিনে এনে সেলাই করে কম্বল তৈরি শুরু করেন। তৈরি কম্বলগুলো সাইকেলের পেছনে তুলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফেরি করে বিক্রি করেন। ফলে বদলে যায় তাদের জীবন। পরবর্তী সময়ে এ ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতেও।
এ দুই ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে এখানকার ৮০ ভাগ কারিগর নারী। এখন তারাই উপার্জনের প্রধান হাতিয়ার।
মাইজবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তালুকদার জাহাঙ্গীর আলম ও চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান বলেন, কম্বল ব্যবসায়ীদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ প্রদান ও ঝুট বাজারখ্যাত শিমুলদাইড় বাজারে সরকারি ব্যাংকের একটি শাখা স্থাপন এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে কাজীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হাসান সিদ্দিকী বলেন, প্রয়াত স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এখানে ব্যাংকের শাখা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ কর্মসংস্থান ব্যাংকের একটি শাখা অল্পদিনের মধ্যে কাজ শুরু করবে বলে আশা করছি। তিনি দেশের বিভিন্ন উপজেলার ইউএনওদের চিঠি দিয়ে এখান থেকে কম্বল কেনার অনুরোধও জানিয়েছিলেন।
