করোনা মহামারীর মধ্যে সরকারি চাল আত্মসাতে অভিযুক্ত ও তুমুল সমালোচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া আওয়ামী লীগ নেতা মো. শাহ আলমকে সমাজসেবায় ‘বিশেষ অবদানের’ জন্য সম্মাননা দেওয়া নিয়ে জেলাজুড়ে চলছে তোলপাড়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কাছে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) ব্যাখ্যা চাওয়ার পর জবাব দিয়েছেন তিনি। এ ব্যাখ্যায় তিনি আওয়ামী লীগ নেতার অতীত কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি যুক্ত করে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুল হাসান তাপসের দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি জেলা প্রশাসক। আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলমই এসব তথ্য উপপরিচালককে সরবরাহ করেন বলে খবর বেরিয়েছে।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জাতীয় সমাজসেবা সম্মাননা কেলেঙ্কারির বিষয়টি জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খাঁন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার এক চিঠিতে বিষয়টি তিনি তাদের অবহিত করেন।
চিঠিতে জেলা প্রশাসক বলেন, গত ২ জানুয়ারি জেলায় জাতীয় সমাজসেবা দিবস-২০২১ পালন উপলক্ষে সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। করোনাকালে বিতর্কিত কার্যক্রমের জন্য ওএমএস ডিলারশিপ বাতিল হওয়া মো. শাহ আলমকে সম্মাননা প্রদান করায় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাসমূহে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় মো. শাহ আলমকে সম্মাননা প্রদানের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে গত ৩ জানুয়ারি এক স্মারকে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকের নিকট ব্যাখ্যা প্রদানের অনুরোধ করা হয়। এ প্রেক্ষিতে গত ৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ব্যাখ্যা প্রদান করে জবাব দেন। কিন্তু সন্তোষজনক জবাব দাখিল করতে পারেননি তিনি। জাতীয় সমাজসেবা দিবসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে কোনো দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক দপ্তরের সার্বিক সুনাম ক্ষুণœ হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক তার দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করেন। ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে দেওয়া চিঠিতে জেলা প্রশাসক কোনো দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে ‘সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের’ নিমিত্তে সম্মাননা প্রদানের জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুরোধ জানান।
জানা গেছে, সমাজসেবার উপপরিচালক জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া চিঠিতে আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলমের ‘সমাজসেবার’ ফিরিস্তি উপস্থাপন করেন। জেলা প্রশাসকের দেওয়া চিঠির প্রেক্ষিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক তার ব্যাখ্যায় কীভাবে বাছাই করা হলো সেটি তুলে ধরেন। গত সোমবার ওই নেতা উপপরিচালকের কার্যালয়ে গিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে নিজের ‘সমাজসেবার’ কর্মকা-ের বিষয়ে তথ্য তুলে ধরেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের এজিএস থাকা অবস্থায় বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো, ১৯৯৪ সালে বস্তি উন্নয়ন কর্মকা- করে প্রশংসা কুড়ানো, ২০০১ সালে সফল সমাজকর্মী হিসেবে সম্মাননা লাভ, ২০১১ সাল থেকে অন্ধ কল্যাণ সমিতির সভাপতি হিসেবে কাজ করা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা, সরকারি শিশু পরিবারের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে থাকাসহ বেশকিছু কর্মকা-ের একটি লিখিত তালিকা উপপরিচালকের কাছে জমা দেন মো. শাহ আলম।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মাসুদুল হাসান তাপস বলেন, ‘আমরা মোট তিনজনকে সম্মাননা দিয়েছি। এর বাইরেও একাধিক প্রস্তাবনা এলে বাছাই করা হয়।’ জেলা প্রশাসকের চাওয়া ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গত সোমবার সন্ধ্যায় সবকিছু প্রস্তুত করে জবাব দেওয়া হয়েছে। সম্মাননাপ্রাপ্ত শাহ আলম কী ধরনের সেবা কর্মকা- করে মনোনীত হয়েছেন সে বিষয়েও উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে ব্যাখ্যায়।’
