মোবাইল ফোনে পরিচয়ের সূত্রে প্রেম। তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত দুজনের। সে অনুযায়ী বিয়ের সব আয়োজনও সম্পন্ন করে ফেলে কনেপক্ষ। তবে বিয়ের জন্য মেয়ের পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফাঁকি দিয়েছে সেই প্রেমিক।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, বিলাসপুর ইউনিয়নের এক তরুণীর (২২) সঙ্গে ফোনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে রাজশাহী শহরের বাসিন্দা এক যুবকের সঙ্গে। ৩ জানুয়ারি বিয়ের দিন ধার্য হলেও বিয়ের দিন বরপক্ষ আসেনি কনেকে নিতে। এ ঘটনায় এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার অন্ত নেই।
ওই তরুণী ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, ওই তরুণীর বাবা একজন ব্যবসায়ী। তার সঙ্গে মোবাইল অ্যাপস ইমোর মাধ্যমে বছরখানেক আগে ওই যুবকের পরিচয় হয়। এরপর ফোনে কথা বলতে বলতে প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিজেকে পুলিশ সদস্য পরিচয় দিয়ে ওই যুবক মেয়েটিকে জানান যে তিনি রাজশাহী শহরের বাসিন্দা। বাবা বেঁচে নেই। একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে শরীয়তপুরের নড়িয়া থানায় চাকরি করছেন।
একপর্যায়ে ওই যুবক বাণীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে বাণী বিষয়টি তার পরিবারকে জানান। পরে বাণীর পরিবার ওই যুবক ও তার চাচা পরিচয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপ আলোচনার পর বিয়েতে মত দেন। গত ৩ জানুয়ারি (রোববার) বিয়ের দিন ধার্য হয়। ৪০ জন বরযাত্রী আসার কথা।
এরই মধ্যে ওই যুবক বাণীকে জানান, তার নাকি আইডি কার্ড হারিয়ে গেছে। বেতনের টাকা তুলতে পারছেন না। তাই বিয়ের খরচের জন্য বাণীর পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন ওই যুবক। বিয়ের আগে টাকা না পেলে নাকি তার বিয়ে করা সম্ভব হবে না। মেয়ের বিয়ের জন্য তার চার শতাংশ জমি বিক্রি করেন তার বাবা। বিয়ের জন্য আরো এক লাখ টাকা ঋণ করেন।
বিয়ের এক সপ্তাহ আগে তারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ওই যুবককে ৭০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। বাকি টাকা দিয়ে বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন করেন। বিয়ের আগের রাত পর্যন্ত বাণী ও তার পরিবারের সঙ্গে ওই যুবকের ফোনে যোগাযোগ ছিল। বিয়ের দিন সকাল থেকে বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলতে থাকে এবং মেহমানরাও আসতে থাকেন। বরযাত্রী কতদূর, তা জানার জন্য বাণীর পরিবার ওই যুবকের মোবাইল ফোনে কল করলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর একাধিক নম্বর দিয়ে বার বার কল করেও কোনো কাজ হয়নি। বরের মোবাইল ফোন বন্ধ জানতে পেরে বাড়ির সবাই চিন্তিত হয়ে পড়েন। লোকজনের মধ্যে সন্দেহ বাড়তে থাকে। থেমে যেতে থাকে বিয়ের আয়োজন ও কোলাহল। দিশেহারা হয়ে পড়ে বাণীর পরিবার। কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত তাদের সন্দেহই সত্যি হয়েছে। বরবেশে ওই যুবক আসেননি। বাণীরও বধূর সাজে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হয়নি। এ ঘটনায় হতবাক হয়ে যান পুরো এলাকার লোকজন।
ওই তরুণী বলেন, আমার পরিবার গরিব, তাই আমার বেশি পড়ালেখার সুযোগ হয়নি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। সোহাগের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ইমো গ্রুপের মাধ্যমে। তারপর মোবাইল ফোনে কথা হতো, পরে আমার সঙ্গে সম্পর্ক হয়। ও আমাকে বলেছে, ওর বাড়ি রাজশাহী শহরে এবং সে নাকি নড়িয়া থানায় পুলিশে চাকরি করে। নড়িয়াতে আমি তার সঙ্গে দুইবার দেখা করেছি। সে আমাকে বিয়ে করবে বলেছিল। তাকে বিশ্বাস করে আমার পরিবার ৭০ হাজার টাকা পাঠিয়েছে এবং বিয়ের আয়োজন করে। কিন্তু সে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
তিনি বলেন, আমার মোবাইলে সোহাগের একটি ছবি আছে। ছবিতে কোন কোম্পানির সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম পরে আছেন। ইউনিফর্মে লেখা আছে সোহাগ ও সিকিউরিটি।
বাণীর বাবা মালেক চৌকিদার বলেন, ওই যুবকের সঠিক পরিচয়ও কেউ জানেন না। আমি গরিব মানুষ। লেখাপড়া জানি না। সহায়-সম্পত্তি তেমন কিছুই নাই। দিন আনি দিন খাই। দুই কড়া জমি ছিলো, তাও মেয়ের বিয়ের জন্য বিক্রি করে দিছি। টাকা-পয়সা খুইয়ে শেষ পর্যন্ত মেয়ের বিয়ে দিতে পারলাম না। আমাদের মান-ইজ্জত সব গেছে। এখন আমার মেয়ের কী হবে?
জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজহারুল ইসলাম সরকার বলেন, এ বিষয়ে আমি শুনলাম। ভুক্তভোগী পরিবার এখন কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেননি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশ্রাফুজ্জামান ভূইয়া ফোনে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার যদি লিখিত অভিযোগ করে, তাহলে মোবাইল ট্র্যাকিং করে ওই যুবকের তথ্য জানা যেতে পারে। এটা একটি দুঃখজনক ঘটনা।
